ছোটবেলায় স্কুলের
পাঠ্যবইতে একটা গল্প পড়েছিলাম। নাম ভিলেজ পলিটিক্স। যতদুর মনে পড়ে বিষয়টা এমন;
রহিম এবং করিমের
বাড়ি পাশাপাশি। রহিমের বাড়ির আমগাছের একটা ডাল চলে গেছে করিমের সীমানায়। উকিল জলিল
করিমকে বললেন, পরের গাছের ডাল তোমার এলাকায়, কেটে ফেল। আইনত সেটা তুমি করতে পার।
করিম ডালটা কেটে
ফেলল। রহিমের জন্য জলিলের পরামর্শ, তোমার গাছের ডাল আরেকজন কেটে ফেলল, একটা মামলা
ঠুকে দাও।
বিচারক বললেন,
জেনুইন কেস। মামলা চলতে পারে।
ব্যাস, হয়ে গেল।
মামলা চলতে থাকল। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। বাঘে ছুলে আঠার ঘা, পুলিশে ছুলে
ছত্রিশ ঘা আর উকিলে ছুলে বাহাত্তর ঘা। ঘা শুকাতে রহিম-করিম দুজনকেই বাড়ি বিক্রি
করতে হল। টাকাগুলো কোথায় জমা হল সেটা হয়ত বলা প্রয়োজন নেই।
বরং সাম্প্রতিক
এক ঘটনার কথাই উল্লেখ করা যাক। পরিচিত এজন যায়গা কিনেছেন উত্তরায়। বছর ত্রিশের
বেশি সেখানে বাড়ি বানিয়ে বাস করছেন। বাবা মারা গেছেন। একদিন হঠাত করেই জমির
বিক্রেতা মামলা ঠুকে দিলেন, যতটুকু যায়গা বিক্রি করা হয়েছে তারচেয়ে বেশি দখল করা
হয়েছে।
পরিচিত ব্যক্তিকে
দৌড়াতে হল কাগজপত্র নিয়ে এখানে-সেখানে। মামলা চলতে শুরু করল। উল্লেখ বিক্রেতার
বাবার মারা গেছেন, তার উত্তরাধিকারী পুত্রকে একদিন সামনে পেয়ে বলেই বসলেন, জমি তো
আমাদের, মামলা করলেন কেন ?
সহজ করল উত্তর,
ইচ্ছে হল, করলাম।
বিষয়টা যদি এখানে
থেমে থাকত তাহলে সমস্যা ছিল না। পিছনে যদি উকিল থাকে তাহলে বিষয় থেমে থাকে না। এরই
মধ্যে সে হাত করেছে জমির হিসেবপত্র রাখার অফিস। আদালত হাত করা প্রয়োজন নেই, কেস
চললেই তারা খুশি। ওটাই তো পেশা।
গিট্টুটা লেগেই থাকল।
না পারবেন জায়গা বিক্রি করতে, না পারবেন ঘরবাড়ি বানাতে। সবকিছু বাদ দিয়ে এখান থেকে
ওখানে, ওখান থেকে সেখানে ছুটুন। আর নিতান্ত বিরক্ত হলে যায়গা ছেড়ে ভাগুন।
বাংলাদেশে কত লক্ষ
মামলা জমে আছে সেখবর মাঝেমাঝে পত্রিকায় দেখা যায়। দুচারজন টিভিতেও বক্তৃতা দেন।
একটা বিষয়ে আইনবিদ আর পুশি কর্মকর্তাদের বড় মিল। অবসরে গেলে তারা মানবাধিকার কর্মী
হন। পুলিশের কি পরিবর্তন প্রয়োজন আর আইনে কি পরিবর্তন প্রয়োজন সেকথা শোনান। ঢেকি
সর্গে গেলেও ধান ভানে। তারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের উপকার করতেই থাকেন।
পুরনো কথায় ফেরা
যাক। লক্ষ লক্ষ মামলার ৮০ ভাগের বেশি জমি সংক্রান্ত। অমুক দিন তমুকের ইচ্ছে হল,
মামলা ঠুকে দিল। অমুকের বাড়ির দেয়ালের ভেতরে অর্ধেক যায়গা আমার। এই যে দলিল।
অধিকাংশ মামলায়
মুল মালিক এরই মধ্যে মারা গেছেন। মামলা চালানোর মত উত্তরাধিকারী অবশ্য আছে। তাদের
ধরনও পাল্টেছে। নতুন প্রজন্ম রাস্তাঘাট আরো ভাল চেনে, আইন আরো ভাল জানে।
যদি জমি নামের
কোন বস্তু এখনও থেকে থাকে তাহলে একটু সাবধানবানি শুনিয়ে দেই, পারলে ওটা সিন্দুকে ঢুকিয়ে রাখুন। বলা যায় না
কারো নজর লাগতে পারে। প্রতিবেশি কিংবা এলাকার প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাসিন দলের
নেতা কিংবা হাউজিং কোম্পানী।
ভিলেজ পলিটিক্স
নামের গল্পটার অস্তিত্ব এখনো আছে কিনা জানা নেই। যদি থেকেই থাকে তাহলে সেটারও নিশ্চয়ই
পরিবর্তন প্রয়োজন। বিষয়টা এখন ভিলেজে থেমে নেই। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
কাজেই নতুন নাম হতে
পারে বাংলা পলিটিক্স।
0 comments:
Post a Comment