একদিনের চিড়িয়া

Oct 3, 2009

বাঘ-সিংহ-জিরাফ- চিতাবাঘ সব একেএকে বিদায় নিচ্ছে কবে শুনব সেখানে মডেল টাউন গড়ে উঠেছে আগেই অন্তত একবার ঘুরে আসা উচিত চিড়িয়াখানায় একবারও চিড়িয়াখানায় যাব না তাও কি হয়! একদিন মিনিবাসের চিড়িয়াখানা’ ‘চিড়িয়াখানাডাক শুনতে শুনতে তাতে উঠেই পরলামক্ষতি কি, খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে তো দেবে নাসেখানে রাখলে খাওয়ানোর দায়িত্বও নিতে হবেআগের আপদরাই যখন মরছে তখন আর নতুন করে আপদের দায়িত্ব নেবে কে কাজেই ঘোড়ায় চড়িয়ে মর্দ হাটিয়া চলিল, আমিও মিনিবাসে চড়ে হাটিয়া চলিলাম এবং একসময় পৌছেও গেলাম

যেখানে নামলাম সে যায়গাটা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলচমকারএটা কি ঢাকা শহর! এমন যায়গা দেখতে আমি প্রতিদিন আসতে পারিচারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজশুধু গাছপালাশুনলাম পাশেরটির নাম বোটানিক্যাল গার্ডেনওখানে ঢুকতে পয়সা লাগে নাঢুকে ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ানো যায়, বসে থাকা যায়, হাওয়া খাওয়া যায়, এমনকি দুর থেকেই দুএকজনকে দেখলাম বসে থেকে একটা করে ঘাস তুলে মুখে দিচ্ছেসত্যিই চমকারচিড়িয়াখানা থেকে বের হয়েই ওখানে ঢুকতে হবে

ঢাকা চিড়িয়াখানা, মীরপুরএইই লেখা আছে এক যায়গায়বেশ কিছুটা উঁচুতেঅনেক দুর থেকে দেখা যায়সাদাটে পিলার দিয়ে যতটা সম্ভব উচু করা হয়েছেআমার মনে হল রঙটি বোধ হয় অন্যরকম হলে ভাল হতচারিদিকে সবুজের মধ্যে সাদা, কেমন যেন চোখে লাগেছবিতে অন্য দেশের চিড়িয়াখানা দেখেছিসেগুলি কেমন যেনচিড়িয়াখানা বলেই মনে হয়এটা মনে হচ্ছে সার্কাসতারাওতো বাঘ, হাতি নিয়ে এক যায়গায় আসন গাড়ে, নানারকম খেলা দেখায়এখানেও কি খেলা দেখা যাবে ?

চারিদিকে তাকালামবেশ কয়েকটি রিক্সা দাঁড়িয়েযার যেভাবে খুশীতবে বেশীরভাগই দাঁড়িয়ে থাকা মানুষছোট ছেলেমেয়ে খুব একটা দেখলাম না, বাদামবিক্রেতা এবং হাতপাতাগুলি ছাড়াহয়ত সবারই দেখা হয়ে গেছে, আমার মত যারা বয়স্ক, অথবা তরুনতরুনী তাদেরই হয়ত দেখা হয়ে ওঠেনিআর আছে ঢাকায় নবাগতরাতা পোষাক আষাক দেখেই তাদের চেনা যায়আমি ওদের দলে নইওদের গায়ে এখনো ঢাকার গন্ধ লাগেনিঢাকায় আসলে প্রথমেই ঢাকার গন্ধ মাখতে হয়একজন ভিক্ষুককেও রেগে আরেকজনকে বলতে শুনেছি, ‘কদিন হল এসেছিস? আমি দশ বছর ধরে ঢাকায় ভিক্ষে করি

একযায়গায় দেখলাম লম্বা লাইনবুঝলাম ভেতরে ঢুকতে হলে ওই লাইনে আগে দাঁড়াতে হবে, টিকিট কিনতে হবেদাঁড়ালাম এবং একসময় ছোট্ট কাগজের টিকিটও হাতে পেলামআশেপাশে বাদাম-লজেন্স-মোয়া বিক্রেতাদের দিকে ভ্রুক্ষেপও করলাম নাএকটি রোগা পটকা ছেলে যেন বলল ভেতরে যাওয়ার টিকিটএটা আবার কোন ধরনের আবদারভেতরে ঢুকে কাজ নেইবাইরেই থাকলোকজন কত দুরদুরান- থেকে এসেছে একটু বিনোদনের জন্য, সেখানে যেয়ে তাদের বিরক্ত করার দরকারটা কি ? বাইরেই ভাল আছিসঅন্তত আছিস তো এক যায়গায়আর পারিশ তো কোন ফুটোফাটা দিয়ে ঢুকে পর ভেতরে, আমাকে জ্বালাতন করিশ কেন বাবা

আমি ঢুকে পরলামএদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি কয়েকটা পেয়ারা গাছসোজা এগিয়ে গেলামবেশ ভীড় দেখতে পাচ্ছি এক যায়গায়আমিও ভিড়ে মিশে গেলামমোটা মোটা লোহা দিয়ে ঘেরা যায়গাবেশ দুরে একটা বাঘ বসে রয়েছেহ্যাঁ, বাঘই তোবসে না, শুয়ে রয়েছেমনে হল ওঠার শক্তি নেইএভাবে শুয়ে থাকা বাঘ কেউ টাকা দিয়ে টিকিট করে দেখে? দুএকজন খোঁচাখুচি করে তাকে জাগানোর চেষ্টা করল, কাজ হল নাআশা নেই দেখে সময় নষ্ট না করে সামনে এগোলাম

দেখি আরেকটি খাঁচাসেখানেও বাঘএর অবস্থাও তথৈবচবোটকা গন্ধ ছড়াচ্ছেবাঁদিকে তাকিয়ে দেখি কয়েকটা হরিন হেঁটে বেড়াচ্ছেযাহোক, নড়াচড়া তো করছেকিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে তাদেরই হাঁটাচলা দেখলাম

বাঁদরের খাঁচা কোথায় ? ওটাই তো আসল দেখার যায়গাআমাদের পুর্বপুরুষ কেমন ছিলেন না দেখলে, তাদেরকে একটু না খোঁচালে কেমন হয়আমাদের এত দুঃখকষ্টের জন্য তারাই দায়ীকে বলেছিল তাদেরকে লেজ খসিয়ে জামাকাপড় ধারন করতেগাছের ডালে থাকলে দিব্বি ফলমুল খেয়ে কাটানো যেত, আর বাঘ হরিন দেখার জন্য টাকা খরচ করে টিকিট কিনতে হত নাদিব্যি দেখা যেত, যখন তখন

কিন্তু বাঁনরের খাঁচা আমি খুঁজে পেলাম নাএকজনকে জিজ্ঞেস করায় এমনভাবে তাকালেন যেন আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজে কোথায় জিজ্ঞেস করছিকি আর করারাগ করে বেরিয়ে গেলেও যেতে পারি, কিন্তু টাকা খরচ করে ঢুকেছি, কিছুটা সময় না কাটালে টাকা উসুল হয় কিভাবেতখনই দেখলাম ভিড়, তারপর বানরের খাচা আমিও যোগ দিলাম ভিড়ে

সত্যিকারের ভিড়টা এখানেই যে যেভাবে পারে মুখ ভ্যাঙচাচ্ছে, অঙ্গভঙ্গি করছে একটা বাচ্চা বানর সেটা দেখার জন্য খাচা ধরে ঝুলে আছে পেছন থেকে সম্ভবত তার মা তাকে নামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না আমি যেন শুনতে পেলাম তার বক্তব্য, মা দ্যাহ, দ্যাহ কেমুন চিড়িয়া আইছে

তাড়াতাড়ি সরে গেলাম সেখান থেকে এবারে যেদিকটায় ভীড় কম সেদিকে হাঁটতে শুরু করলামলেক না পুকুর কি বলব জানি না, তার ধার দিয়ে হেঁটে সবুজ ঘাঁসে ঢাকা একটা যায়গায় পৌছে গেলামবাহ্‌, বেশ যায়গাসামনের সব দৃশ্য দেখা যায়খাঁচার ভেতরের এবং বাইরের, সবইসেখানেই বসে পরলাম

আমার কপালে আসলে সুখ নেইএকটু পরই একজন যুবক এসে চটপটি খাওয়ার নিমন্ত্রন জানালঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম সেখানে রঙচঙে টিন দিয়ে বানানো একটি ঘরবুঝলাম তার মতলবচটপটি নামের বস্তুটি খেয়ে পকেটের টাকা তার পকেটে পাঠানো প্রয়োজনআমি হাসিমুখে জানালাম যে আমার ও বস্তু খাওয়ার কোন আগ্রহ নেইযুবকটি দেখলাম ভদ্রতার ধার ধারে নারাগতভাবে বলল, ‘তাইলে এইহানে বসছেন ক্যান ?’

আমি চারিদিকে একবার ভাল করে তাকিয়ে দেখলামএ যায়গাটির মালিকানা তাদের বলে মনে হল নাআর আমি তো ভেতরে ঢোকার জন্য রীতিমত টিকিট কেটেছি, কাজেই এখানে বসার অধিকার আমার আছেআলব আছেআমি তাকে সেটা বলার জন্য মুখ খুললামসাথে সাথেই থামতে হল আমাকেআরেকজন, আমার পাশেই বসেছিলেন, বললেন, ‘খান না, অসুবিধে কি? না খেলেও টাকা দিতে হবেওরা অনেক টাকা দিয়ে এ যায়গায় দোকান দিয়েছে

বুঝলাম তিনি ভুক্তভোগীতার পাশেই রয়েছে একটি ছোট প্লেটএখানে বসার মাশুল হিসেবে তাকেও গলাধরন করতে হয়েছে স্বে বস্তুতিনি নিষয়টি আরো স্পষ্ট করে দিলেন, ‌একজোড়া ছেলেমেয়ে তেহাড়ি খেয়ে আটশ টাকা বিল দিয়েছে

এরপর যা ঘটল তার বিররন দেয়া কষ্টকরতিনদিনের নাকি তিন সপ্তাহের, নাকি তিনমাসের পুরনো কিছু দ্রব্য এনে হাজির করা হল আমার সামনেএকবার ভাবলাম সামনের পানিতে সেগুলি ফেলে দেইআবার মনে হল এখানে অনেক বিরল প্রানী রয়েছেবহু টাকায় আমদানী করাকুমির, নাকি জলহস্তিজলহস্তি হলে তো সুদুর আফ্রিকা থেকে আনাএগুলি জাতিয় সম্পদআমার দোষে তাদের যদি ক্ষতি হয়, যদি অক্কা পায়, নিদেন পক্ষে ডায়রিয়া হয়আমি প্লেটটি সেখানেই রেখে দাম দিয়ে উঠে পরলাম এবং টিকিটের টাকা উসুল না করেই বাইরে এসে পরলামবোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে একবার তাকানোর ইচ্ছেও হল না

0 comments:

 

Browse