একসময় মানুষ মনের দুখে বনে যেত। যখন নিজের পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সমাজ সবকিছু অসহ্য মনে হত, মনে হত তাদের সাথে থাকা যায় না তখন রওনা দিত বনের দিকে। সেখানে বাঘ-ভালুক-সাপ-মশা-গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত-গরম-ক্ষুধা-নিদ্রা সব সমস্যা মেনে নিত। তারপরও তার মন বলত, সমাজের থেকে ভাল আছি। সেখানে একমনে থাকা যায়। মুনি-ঋষি পর্যায়ের মানুষ যেমন তেমনি সাধারন ঘরের মানুষও হঠাৎ করে বনবাসী হয়ে যেত। আর রামায়ন মহাভারত থেকে শুরু করে গল্প-উপকথা হলে তো কথাই নেই। কথায় কথায় বনবাস নয়ত বনে নির্বাসন।
সে যুগ গত হয়েছে বহুকাল। এখন বন নেই। যেটুকু আছে তা ডাকাত আর সন্ত্রাসীদের দখলে। ইচ্ছে থাকলেও যাবার উপায় নেই।
তবে ইচ্ছে হওয়াটা অস্বাভাবিক না। যুক্তির বিচারেই হোক আর আবেগের বিচারেই হোক, বন খুব ভাল যায়গা। প্রথমত যেখানে ঝগড়াঝাটি-গালাগালি-মারামারি নেই। বনে কেউ এসে গায়ে পড়ে কথা বাড়ায় না, পথ চলিতে যদি চকিতে গুতো দেয় না, নানারকম সাজপোষাক নিয়ে ভেক ধরে কেউ দেখাতে আসে না সে কত বড়, কত সুন্দর, কত ধনী, কত মহৎ, কত জ্ঞানী, কতবড় ত্যাগী, কতবড় বাক্যবাগিস। সেখানে এসব পাত্তা পায়না। যে যার সে তার।
দ্বিতীয়ত, এবং এটাই মুখ্য, সেখানে খাবারে ভেজাল থাকে না। অনাহারে থাকার সম্ভাবনা আছে তো বটেই, কারন বনের বাইরে থেকে প্রতিমুহুর্তে তাদের সম্পদ চুরি করা হচ্ছে, তারপরও অমুকের সাথে তমুক মেশানোর বিষয়টি নেই। ইতিহাসে যারা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বনবাসে কাটিয়েছেন কোনরকম রোগবালাই ছাড়াই তার একটা বড় কারন হয়ত এটাই। তারা না খেয়ে থাকলে থেকেছেন কিন্তু ভেজাল খাননি। আর কখনো যদি রোগবালাই হয়েই যায় তখন ভেজাল ডাক্তারের কাছে যাননি এবং ভেজাল ওষুধ খাননি।
ভেজাল শব্দটা নিয়ে বিতর্ক করতে পারেন। কেউ যদি পরীক্ষার হলে টুকলি করা কাগজ নিয়ে যায় তাকে বলে নকল। যদি পুরো বইটিই নিয়ে যায় তাকেও কি নকল বলবেন ? না আসল বলবেন ?
ভেজাল বিষয়টি তেমনই। মুল জিনিষের সাথে অন্যকিছু মেশালে তাকে বলে ভেজাল, আর পুরো জিনিষটিই যদি একের বদলে অন্য দিয়ে তৈরী হয় তাকে কি ভেজাল বলা মানায়।
ওষুধ কোম্পানীর লোকেরা জ্ঞানী। তারা আটা দিয়ে ট্যাবলেট বানাতে পারেন, ট্যানারীর কেমিকেল দিয়ে সিরাপ বানাতে পারেন, পছন্দমত রং গুলে যেকোন ওষুধই বানাতে পারেন। সেখানে সামান্য পরিমানে হলেও মুল পদার্থ থাকে। অন্তত চোখের দেখায়, গন্ধ শুকে যেন টের পাওয়া সেটা আসলে কি। তারপরও, শুনতে যত খারাপই লাগুক, সেটা ভেজাল ছেড়ে আসলের পর্যায়ে যায়নি। এই চোখে দেখা, গন্ধ শোকার পর্যায় তারা ধরে রেখেছেন। এখনো পুরোপুরি আসল ওষুধ তৈরী করেননি। অচিরেই করবেন। রাসায়নিক মিশ্রনবিদ্যায় এদেশ এতটাই এগিয়ে যে অনায়াসে বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে পারে। চালের সাথে পাথরের যুগ, সেতো প্রস্তর যুগ। এখন প্লাস্টিকের তৈরী চাল পাওয়া যায়। একমাত্র হজমপ্রক্রিয়া টের পায় সেটা কোন জাতের চাল।
একসময় যখন সেটা প্রকাশ পায় তখন ওষুধ প্রক্রিয়া। একজন অভিজ্ঞতার গল্প করলেন, একেবারে যখন মরোমরো অবস্থা তখন যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে বিষ খেলেন। সাথেসাথে মন্ত্রবৎ সুস্থ। বিষে বিষক্ষয় বোধহয় একেই বলে।
ওষুধ খেয়ে হাসপাতালে ডজন ডজন শিশু মারা যায় (বাপরে, হাসপাতালে ওষুধ খেয়ে মৃত্যু) দেশে প্রতিদিন যে হাজার হাজার মারা যাচ্ছে তার কারন কে দেখেছে ?
বিস্কুট খেয়ে মারা যায়, ভিটামিন খেয়ে মারা যায়, অসুস্থ হয়। বিশেষজ্ঞরা নড়েচড়ে বসেন। একে উপেক্ষা করা যায় না। খবর পাচার হয়ে যাচ্ছে। কি বলছেন, ভিটামিন খেয়ে, বিস্কুট খেয়ে মারা যাচ্ছে ? কখনোই তারা ভিটামিন খেয়ে মারা যায়নি ? আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি ভিটামিনে কোন সমস্যা নেই, বিস্কুটে সমস্যা নেই।
কেন অসুস্থ হচ্ছে ? কেন মারা যাচ্ছে ?
দাড়ান, চিন্তা করতে দিন। সময় দিন। তাড়াহুড়া করবেন না।
হ্যা, পেয়েছি। ওদের পেটে হাই প্রোটিন সহ্য হয় না। সেজন্য অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওদের প্রয়োজন খিচুরী। সেটাই সবচেয়ে ভাল ওসুধ।
প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে কয়েক ডজন মারা গেছে ? ঘাবড়াবেন না। কারখানা সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। কেউ ঢুকতে বেরতে পারবে না। প্রয়োজনে সেখানে ওষুধের বদলে খিচুরির কারখানা বসানো হবে। প্যাকেটে করে নির্ভেজাল খিছুরি দেয়া হবে। আপনারা ওদিকে ভিড় করবেন না। আর প্রশ্ন করবেন না।
মৃত্যুর দায়িত্ব কার জিজ্ঞেস করছেন ? জন্ম-মৃত্যু আল্লার হাতে। তার ইচ্ছা ছাড়া কিছু হয় না। নাফরমানী কথা বলবেন না, এখানে আমাদের কিছু করার নেই। আর যাই হই, বিধর্মী হতে পারব না।
শুরু করেছিলাম বনবাস দিয়ে। সত্যিই, সেই দিনের তুলনা হয় না। কোনভাবে যদি সেই দিন ফিরে পাওয়া যেত!
0 comments:
Post a Comment