একসময় মানুষ ভিসিআর নামের এক যন্ত্র আবিস্কার করেছিল। আরো নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় ভিএইচএস, ভিডিও হোম সার্ভিস। সেটাকে বাড়ির টিভির সাথে লাগাবেন আর ভিডিও ক্যাসেটে যা আছে দেখবেন। যতবার খুশি ততবার। যিনি বা যারা আবিস্কার করেছিলেন তারা নিশ্চয়ই তৃপ্তিবোধ করেছিলেন এতে। একবার দেখে প্রয়োজন না মিটলে শতবার দেখা যাবে। অমুক প্রফেসর লেকচার দিচ্ছেন, তার সামনে বসে ভীড় বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। বাড়িতে বসেই সেটা দেখে নেবেন। শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে যাবে। ঘরে ঘরে শিক্ষা পৌছে যাবে।
তবে এই ভ্রান্তি ভাঙতে সময় লাগেনি। দেখা গেল মানুষ প্রফেসরের লেকচার দেখতে পছন্দ করে না। আর করবেই বা কেন হলিউড-বলিউডের মুভি থাকতে। ওগুলো সিনেমা হলে দেখা যায় না। দেশ চালায় ওদের মাথায় কি আছে কে জানে, বছরে একটা দুটা উৎসব করে আর সেখানে রদ্দিমার্কা ছবি দেখায়। তারচেয়ে এই ভাল। দোকান থেকে ভাড়া আনো আর দেখ। চাহিদা ভাল থাকলে ব্যবসাও করা যায়। ওইসব লেকচার শোনে কে? ওরা কি এদের মত খরচ করে ?
আসছে খরচের বিষয়টিও কথার কথা। হলিউডের একটা ছবি তৈরী করতে সময় লাগে ছয় মাস, কখনো কখনো বছর। পর্ণো ভিডিও তৈরী করতে লাগে কয়েক ঘন্টা। তারপরও কত যত্ন করে তৈরী করে। কার কি পছন্দ হিসেব করে মাথা ঘামিয়ে তৈরী। এসব থাকতে লেকচার শুনতে যাবে কে ? ওইসব উটকো লোকজন উটকো কথাবার্তা বলে এতদিন চোখকান বন্ধ করে রেখেছে। টিভিতে দেখানো যাবে না, সিনেমা হলে দেখানো যাবে না। অপসংস্কৃতি টুক করে কোনফাকে ঢুকে পড়বে।
অপসংস্কৃতি আবার কি-রে বাবা। এতদিনেও শেখেন নাই উপকারডা কোনখানে। সকলেই কমবেশি হিন্দী কইতে পারে এইডা কি কম শিক্ষা। এত কম পরিশ্রমে বিদেশী ভাষা শিক্ষা দেখাইতে পারবেন ? দ্যাহেন না পশ্চিমের দেশগুলার কত চেষ্টা কইরাও শেখাইতে পারে নাই। এত স্কুল-কলেজ কইরাও বাংলা শিখাইতে পারে নাই। দেইখা শেখেন কেমনে ভাষা শিখাইতে হয়। মাইক্রোফোনের সামনে আইসা চিল্লাপাল্লা করতাছেন আর কানে হেডফোন গুইজা হিন্দি গান শুনতাছেন সেইডা আবার কি।
এর ওপর যাদের রুটি-রুজি নির্ভর করে তাদের বিষয় একটু আলাদা। সেইসব নির্মাতারা বুঝলেন তাদের কর্তব্য। পথ একটাই, কশে অনুকরন করা। ওরা কইছে ঠাকুর, আপনে কন কুকুর। মিল থাকলেই হইছে। ওরা কত পর্ব বানাইছে ? হাজার ? আমি বানামু হাজার এক।
আর সেই যন্ত্রের যারা নির্মাতা তারা কিছুদিন বেজায় খুশি থাকার পর মাথায় হাত দিলেন।
এই মাধ্যমের অপব্যবহার অত্যন্ত বেশি। এমন কিছু করা প্রয়োজন যেখানে মানুষ বিনোদন আর শিক্ষা দুইয়েরই স্বাদ পাবে। এডুটেইনমেন্ট। এডুকেশন আর এন্টারটেইনমেন্ট। সেটা হতে পারে কম্পিউটার। মাল্টিমিডিয়া।
কথাটা চাউর হল এখানেও। ব্যস। উঠেপড়ে লাগল সবাই। শতশত, হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শাখা-প্রশাখা-ডালপালা গজাতে শুরু করল। যার যতটুকু সুযোগ আছে পালে হাওয়া লাগানোর লাগালেন। মানুষ জমিজেরাত বিক্রি করে এসে লাইনে দাড়াল। কয়েকটা মাস, তারপরই একজন তরুন মিলিওনিয়ার। বিলিওনিয়ারও হতে পারেন। উদাহরন দ্যাখেন না। বিল গেটস তারপর ষ্টিভ জবস। আরো কত কি।
একসময় ভাটা পরল তাতেও। কয়েক মাস যাওয়ার পর দেখা গেল মিলিওনিয়ার হওয়া বিষয়টা এত সহজ না। লোকে জিজ্ঞেস করে পড়াশোনা কতদুর। কি করতে পার ? নমুনা দেখি ? পিএইচডি আছে ?
বহু টাকা ইনভেষ্ট করে কি খালিহাতে ফেরা যায়। একমাত্র সম্বল হয়ে দাড়াল সিডি কপি করে বিক্রি করা। কেউ কেউ সরতে শুরু করল এই পথ থেকে। কিছু বলতে গেলে ধমকে ওঠে, সফটওয়্যার ডেভেলপার। ভাগ এখান থেকে।
গবেষকরা কারন খুজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ভারতে হচ্ছে এখানে কেন হচ্ছে না।
ও বুঝেছি। ওদের হাই স্পিড ইন্টারনেট আছে, আমাদের নেই।
ব্যস, শুরু হল আরেকটা ঝড়। ষড়যন্ত্র করে দেশকে পিছিয়ে রেখেছে। এই অবস্থা চলতে পারে না। আমরা দ্রুতগতির ইন্টারনেট চাই। যে ভাবেই হোক এটা করতেই হবে। ইন্টারনেটের মধ্যে দিয়ে ডলারের স্রোত আসবে।
আর টাকাই কি সব। টাকা যদি নাই আসে তাতেই বা ক্ষতি কি। সারা বিশ্বের তথ্য আপনার সামনে এসে হাজির হবে এটাই মুল কথা। কম্পিউটারের সামনে বসবেন আর বোতাম টিপে জেনে নেবেন কোথায় কি ঘটছে। কেমন করে ঘুরছে জগত যুগান্তরের ঘুর্নিপাকে। লন্ডন-নিউইয়র্ক যাওয়ার দরকার নেই। সব ঘরে বসেই পাওয়া যাবে। কেমব্রিজ-অক্সফোর্ড-হার্বার্ড সবকিছু।
সেই পুরনো কথা। ভিসিআরের যুগে যেমন বলা হয়েছিল। শিক্ষা ঘরের মধ্যে। বাইরে যাবার প্রয়োজন নেই।
হাইস্পিড ইন্টারনেট এখনো হয়নি, হব হব করছে। যে লো-স্পিড আছে তার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যারা পর্নোগ্রাফির ব্যবসা করে তারা ভাল করেই জানে, বলা উচিত সবচেয়ে ভাল জানে কিভাবে ব্যবসা করতে হয়। মানুষের মনস্তত্ত্ব কি বলে। একেবারে সরাসরি সেখানে গিয়ে পৌছাতে হয়। বর্তমানের লো স্পিডেই মানুষের ঘরেঘরে, হাতেহাতে পৌছে গেছে এই বার্তা। এখন আর ভিসিআরের মত সেকেলে যন্ত্র প্রয়োজন নেই। ডিভিডি, এমপিফোর, মোবাইল। এবার আর অন্যদের থেকে পিছিয়ে থাকা না, শুধু চোখ মেলে দেখা না, নিজেদের অংশগ্রহন। ডলার পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ।
ঘরে বসে দুনিয়ার তথ্য, পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই।
0 comments:
Post a Comment