চুলকাতে চুলকাতে গেল নখের তিনকাণি, হায়রে মজার চুলকানি। আমি সেই ক্লাসিক চুলকানির কথা বলছি না। এমন চুলকানি যা ফুটপাতের জংলি মলমে উপষম হয় না। দল ধরে লাইন করে বসে হাত চুলকাবেন আর টাকা আসবে সেই চুলকানির কথাও বলছি না। আবার কেউ একজন এসে ঠিক আপনার নাকের সামনে দাড়িয়ে নিজের শরীরে যে চুলকানি দিতে শুরু করে তার কথাও না।
এই চুলকানি একবার শুরু হলে আর থামে না। ক্রমেই বাড়তে থাকে। একেবারে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। এমনকি উত্তরাধিকারসুত্রে সেটা দান করে যাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। বরং অধিকাংশ সময় সেটাই ঘটে। একের থেকে পরিবারে, তারপর পাশের বাড়ি, তারপর সমাজ। তারপর একসময় পুরো জাতিই সেই চুলকানির খপ্পড়ে পরে চুলকাতে শুরু করে।
যেমন ধরুন টাকার চুলকানি। এর শুরু হঠাৎ করে। চিরদিন যার কোন বাজারে যাওয়া যায়, কোন জিনিষ কত সস্তায় কেনা যায়, কত চাইলে কোন ফর্মূলায় কোন ভাষায় দাম বলতে হয়, কিভাবে হিসেব করলে দিনের খরচ – মাসের খরচ কমে, সেই হিসাবশাস্ত্র না পড়েও যে এই হিসেবে দক্ষ সে যদি হঠাৎ করে অনেক টাকার মালিক হয়। ব্যস, শুরু হল চুলকানি।
ছোট মাছ! ধুর ওসব পোকামাকড় কেউ খায় নাকি ? বাজার করো রে, কাটো রে, মশলা কেনো রে, তেল কেনো রে। এত ঝামেলা করে কে ? ওইখানে নতুন দোকান দিছে না। কয় ট্যাকা নিব। আমি কি ট্যাকার কেয়ার করি ? দেহি না কত নিতে পারে।
ওই জামাডা ফুটপাত থিকা কিনছেন। এই জামাডা দ্যাহেন। এই যে বোতামডা, এই যে এইহানের ষ্টিকারডা, এই যে এইহানের সিলাইডা। এইগুলান দেইখা চেনা যায় কোনডা ফুটপাতের কোনডা অরিজিনাল। আমি একবার দ্যাখলেই কইয়া দিতে পারি।
কিংবা, আরে ওইডা কোন ফোন হইল। চাইনিজ দুই নম্বর মাল। ওই জিনিষ আমি হাতে নেই না। এইডা দ্যাখছেন। অরিজিনাল হাঙ্গেরীর জিনিষ। কি কন ? হাঙ্গেরী কোথায় ? আরে হাঙ্গেরী হইল নোকিয়ার দেশ। আসল নোকিয়া ওইখানে তৈরী হয়।
এই চুলকানির ফল হচ্ছে তরতর করে টাকা খরচ হতে থাকে।
অর্থের ফাউন্ডেশন যদি ভাল হয় তাহলে সেটা আরেকধাপ বাড়ে। ওইডা করা যাইব না ? কেডা কইছে ? ঘুস খান না ? কত খান না কন দেহি ?
মিনিষ্টারের বাধা আছে ? কোন মিনিষ্টার ? ব্যাংকের একাউন্টা নাম্বারডা দ্যান আর কত লাগব কন। পাঠায়া দিমুনে।
এই চুলকানির স্থিরতা কম। অন্যভাষায় বলতে গেলে এটা সাময়িক রোগ। সিজন পাল্টানোর সাথে সাথে এর হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। দ্রুত যেমন এভারেষ্টের চুড়ায় ওঠে তেমনি দ্রুতই প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে গিয়ে ঠেকে। অল্প মানুষই সিজনিং এর ফল পায়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সহনীয় হয়ে ওঠে। সব ঋতুতে মানিয়ে নিতে পারে।
কিংবা ধরুন ক্ষমতার চুলকানি। সেটা আরো মারাত্মক। সম্ভবত এরসাথে কোন চুলকানিরই তুলনা চলে না।
দেশে জরুরী আইন। কেউ আদালতে যেতে পারবে না। মামলা করতে পারবে না। প্রশ্ন করতে পারবে না। ব্যস, শুরু হল চুলকানি।
ওই ব্যাটা আমার বাড়ির সামনে গাড়ি রাখল ক্যান ? কত ট্যাকা হইছে ? ক্যামনে কামাইছে ? জানে না আমি গোয়েন্দা অফিসে যাতায়াত করি ? কতজন আমারে চেনে ? জানায়া দিমু ? মোবাইল করমু ? ওই ফোনডা আনতো-
ওই ব্যাটা বাড়ির সামনে নক্সা করছে ক্যান ? রাস্তার উপর আইসা পড়ছে না। ইচ্ছা করলেই সরকারের রাস্তা দখল করা যায় ? দেহার কি কেউ নাই ? দেহায়া দিমু-
এই চুলকানির ফল হচ্ছে তরতর করে টাকা আসতে থাকে। হাত চুলকায় নাকি শরীরে অন্য যায়গায় চুলকায় জানার উপায় নেই, তবে চুলকানি ক্রমেই বাড়তে থাকে। সাথে অন্যান্য নানারকম চুলকানি যোগ হতে থাকে। এক থেকে অন্যতে ছড়ায়।
এই দুইয়ের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরী হয় আরেক ধরনের চুলকানী। এটা একেবারে পারমানেন্ট। যোজনের ফল একরকম, বিয়োজনের ফল আরেকরকম। কেউ ফুলতে থাকে কেউ চুপসাতে থাকে, কারো রং ঝলসাতে শুরু করে, কেউ বিবর্ন হতে শুরু করে, কারো নাকে-কানে-গলায়-হাতে অলংকারের প্রদর্শনী শুরু হয়, কারো সবকিছু সংক্ষিপ্ত হতে থাকে। মুখর ভাষা, চুল-চেহারা, হাটার ধরন, শরীরের গঠন, সবই পাল্টে যায় এই বিক্রিয়ায়। আর অতি সহজেই চিনে নেয়া যায় কে চুলকানির রোগী। কার চুলকানি কতখানি।
নতুন জিনিষের চুলকানি সম্ভবত সবচেয়ে নিরাপদ। মোবাইল ফোন নতুন হাতে পেলে যেমনটা হয়। হাতে নিয়ে বসে নাম্বার টিপটে শুরু করে। ওপাশ থেকে কে ধরল তাতে কিছু যায় আসে না। আপনে ক্যাডা ? ঠিকানা কি ? চ্যাতেন ক্যা, ফোন কইরা কি অন্যায় করছি। কি অন্যায় করছি কন তো ? ফোন ব্যবহার করেন ভদ্রতা শেখেন নাই। শিইখ্যা লন। কেউ ফোন করলে আগে স্লামালেকুম কইতে হয়-
কিংবা ঘরে নতুন এসি লাগালে যেমনটা হয়। ঘরের তাপমাত্রা শীতের দেশের মত করে গরম কাপড় গায়ে দিয়ে ঠকঠক করে কাঁপা, কিংবা রাতে লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমানো-
কিংবা নতুন ড্রাইভার। যার কেরামতি না দেখালে চলে না। একবার সামনে একবার পেছনে। একবার ডানে একবার বায়ে। সে সেসব কথা যাকগে-
কথা হচ্ছে, গরুর যখন নতুন শিং ওঠে তখন নাকি সামনে যা পায় তাতেই ঢুঁ মেরে দেখে। ছোট বাচ্চার যখন দাঁত এঠে তখনও নাকি সবকিছু কামড়াতে ইচ্ছে করে। কামড়ানোর জন্য মুখে কিছু দিয়ে রাখতে হয়। চুলকানি রোগটি এসবের মতই প্রকৃতিগত। কমবেশি সবার মধ্যেই থাকে। কে কতটা সামলে চলতে পারে সেটাই কথা।
0 comments:
Post a Comment