লিলিপুট তত্ত্ব

Jul 14, 2009

একসময় সারা বিশ্ব কেপে উঠেছিল ক্লোনিং এর কথা শুনে। একজন মানুষের একেবারে ডুপ্লিকেট বানিয়ে দেবে বিজ্ঞানীরা এমনই সে প্রযুক্তি। এর নাম জিন। কোনমতেই জ্বিন থেকে কম যায় না। এরই মধ্যে থাকে কোন প্রাণীর বৈশিষ্ট। তার রং কি হবে, হাইট কি হবে, স্বভাব কি হবে সবকিছু। কোনমতে যদি সেটা বের করে অন্যকে দেয়া যায় তাহলে সেও হবে তারই মত। এমনকি কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়েছে যে ডাইনোসর তার জিন যদি ব্যবহার করা যায় তাহলে তৈরী করা যাবে হেটে চলে বেড়ানো ডাইনোসর। ব্যাপারটা এতটাই পরিচিত পেল যে স্পিলবার্গ সাহেব এই তত্ত্বের ওপর তিন-তিনটে হলিউডি সিনেমা বানিয়ে ফেললেন। সবগুলো সুপারহিট।

তবে বিজ্ঞানীরা এখন কিছুটা হলেও ধাতস্থ হয়েছেন। এখন একটু রয়েসয়ে কথা বলেন। একটা কারন অবশ্যই অনেক মানুষের পিছে টেনে ধরার প্রবণতা। তারা নতুন কিছু মেনে নিতে চায় না। মানুষ জিন পাল্টে যাকিছু করবে সেটা তারা মেনে নিতে চায় না। ডারউইনের কথাও মেনে নেয়নি। পৃথিবী সুর্যের চারিদিকে ঘোরে একথা বলায় গ্যালিলিওকে রিমান্ডে যেতে হয়েছে। ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। তারপরও পৃথিবী ঘুরেছে। মানুষের পুর্বপুরুষ বানর ছিল এমন তত্ত্ব দেয়ায় ডারউইনকে এখন আর তত গালাগালি করে না কেউ।

কথা হচ্ছে জিন তত্ত্ব নিয়ে। এই জিন নাকি বলে দেয় কোথায় কি পরিবর্তন করতে হবে। কোন প্রোটিন বাড়াতে হবে, কোথায় কমাতে হবে। আর এরই ফলে একেকজন একেক রকম। এক প্রানী থেকে আরেক প্রাণী ভিন্ন। এক মানুষ থেকে আরেক মানুষ ভিন্ন। একজনের স্বভাব থেকে আরেকজনের স্বভাব ভিন্ন।

স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে জন্মের পর যদি একটা ইদুরের লেজ কেটে দেয়া হয়, তার থেকে যে ইদুরের জন্ম নেবে তার লেজও যদি জন্ম থেকে কেটে দেয়া হয়, এভাবে যদি চলতেই থাকে তাহলে একসময় লেজছাড়া ইদুর জন্ম নেবে কি-না। তারা বলছেন, না। সেটা হবে না। লেজ কাটার বিষয়টা বাহ্যিক। আর লেজছাড়া ইদুরের বিষয়টা আভ্যন্তরীন। ইদুর যদি মনেমনে কামনা করে তার লেজ প্রয়োজন নেই একমাত্র তার সেই ইচ্ছাই একসময় প্রতিফলিত হতে পারে তার জিনে। সেই ডাইনোসরঅলারাও এতদিনে বুঝেছেন এভাবে ডাইনোসর তৈরী হয় না। পরিবর্তন করতে হয় একেবারে শুরুতে। ভ্রুন পর্যায়ে। যদি এমন ভ্রুন তৈরী করা যায় যার মধ্যে ডাইনোসরের জিন থাকবে তাহলে অবশ্যই সম্ভব জলজ্যান্ত ডাইনোসর তৈরী।

তবে পরিবর্তন হয়। মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেচে থাকলে বদলায়। কারনে অকারনে বদলায়। এই বিখ্যাত উক্তি সেটাই বলে। পরিবর্তন ভালোর দিকে যায়, নয়ত মন্দর দিকে যায়। পরিবর্তনের পর মানুষ ভাল কাজ করে, নয়ত মন্দ কাজ করে। এই পরিবর্তন বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীন।

আবারও সেই বাহ্যিক পরিবর্তন আর আভ্যন্তরীন পরিবর্তন। কেউ যদি খারাপ কাজ দেখে শেখে সেটা বাহ্যিক পরিবর্তন। পরিস্থিতির কারনে সে খারাপ। যে মুহুর্তে সে ভাল দেখবে, ভাল হওয়ার সুযোগ পাবে, সে ভাল হবে। প্রয়োজন শুধু ভালর মধ্যে রাখা। লেজ কেটে যেমন ইদুরকে লেজছাড়া করা যায়না তেমনি শুধুমাত্র পরিবেশের কারনে কেউ শতভাগ খারাপে পরিনত হয় না। তারমধ্যে ভাল-মন্দ দুইই থাকে। যখন যেটা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় তখন সেটা বিকশিত হয়।

তবে। বিষয়টি যদি ভ্রুনপর্যায়ে ঘটে ?

একজন শিশু জন্মের আগেই যদি এর অস্তিত্ব টের পায়। তার পিতামাতার জন্য বিষয়টি বাহ্যিক বিষয় হতে পারে, তারজন্য সেটা আভ্যন্তরীন। যদি এই জিন নিয়েই সে বেড়ে ওঠে। কখনো অন্য পরিবর্তনের সুযোগ না পায়। তখন কি ঘটবে। বানর যেমন প্রয়োজনের তাগিদে গাছে ওঠা, হামাগুড়ি দিয়ে চলা ছেড়ে একসময় সোজা হয়ে দাড়াতে শুরু করেছিল, সেও কি সেপথেই পরিবর্তিত হবে। তার পুর্বপুরুষের মত অর্থের পেছনে, ক্ষমতার পেছনে, খল রাজনীতির পেছনে, ভন্ডার্মি-মুর্খতার পেছনে ছুটবে ? তার জিনে যে সেটাই ঢুকানো হচ্ছে। তখন কি হবে সেই প্রজন্মের সমাজের চেহারা। কিংবা তার উত্তরপুরুষ, তার উত্তরপুরুষ। এই পথচলা কতদুর যাবে ? একসময় কি কারো কারো মাথায় শিং গজাবে ? যা দিয়ে সমাজে কর্তৃত্ব করা যায়। কিংবা কারো শরীর তৈরী হবে গন্ডারের মত পুরু চামড়া যা দিয়ে যেন সবকিছু সহ্য করে চলা যায়।

না-কি কোনভাবে সেখানে পরিবর্তন আনা সম্ভব ? একজন পিতা কিংবা মাতা যখন মনে করবেন তিনি যেভাবে কাল কাটিয়েছেন সেটা গত, তার সন্তানের জন্য প্রয়োজন অন্য এক সমাজ। অন্যকে গুতো মারার জন্য তার শিং প্রয়োজন নেই, লাথি জোরালো করার জন্য পায়ে খুর প্রয়োজন নেই, থাবা মারার জন্য হাতে বাঘের নখ প্রয়োজন নেই, অন্যকে দমানোর জন্য বাঘের গর্জন প্রয়োজন নেই।

বিজ্ঞানীরা বলেন এই পরিবর্তন ঘটে খুব ধীরে। এত ধীরে যা দেখা যায় না। শত বছর, হাজার বছর তার কাছে তুচ্ছ। তবে সেটা ঘটে। সৃষ্টির শুরু থেকেই ঘটছে। বিবর্তনের পথ ধরেই দুভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সমাজ। একভাগ লম্বাই চওড়াই দুদিকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে সবকিছু, আরেক ভাগ সংকুচিত হচ্ছে। মাঝের বিভাজন রেখা স্পষ্ট হচ্ছে। সুইফট যে লিলিপুটের এবং দৈত্যের দেশের কথা শুনিয়ে গেছেন সেটাই হয়ত গন্তব্য।

0 comments:

 

Browse