বইয়ের নাম বাঙলা নামে দেশ, লেখক আলী ইমাম, প্রকাশক অনন্যা, প্রথম প্রকাশ বইমেলা ১৯৯৭। এক যুগ আগের বই কাজেই সেদিক থেকে বই অনুরাগীর কাছে এই তথ্যে নতুনত্ব নেই। হয়ত অনেকের সেলফে বইটি সোভা পাচ্ছে। হয়ত পড়ে দেখার সময় হয়নি। সেকারনেই বিশেষ বৈশিষ্ট লাভ করেছে বইটি।
পড়তে শুরু করুন। একেবারে ভুমিকা থেকে। ভুমিকার শুরু দেখা যাক;
বাংলাদেশ টেলিভিশনের দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া প্রামান্য অনুষ্ঠানটি প্রযোজনা করেঠি এক নাগাড়ে চার বছর। এই জন্যে ঘুরে বেরিয়েছি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ। বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি।
লেখক সত্যিই দেখেছেন। শুধু বাংলার মুখ নয় আরো অনেককিছু। ৭৫ মিলিয়ন বছর আগের গৌরবময় প্রাচীন ইতিহাস তিনি দেখেছেন এবং তুলে ধরেছেন। সেই দেখারই কিছু নমুনা দেখানো হচ্ছে।
আলেকজান্ডারের সাথে আগমন করেছিলেন কয়েকজন গ্রীক পন্ডিত। তাদের লেখায় ভুগোল এবং ইতিহাসের প্রসংগ এসেছে। খ্রিষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দে পাঞ্জাবের বিপাশা নদীর তীর পর্যন্ত এসেছিলেন আলেকজান্ডার। এরপর তার পক্ষে আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হল না। তার শিবিরে খবর এলো পুর্বে প্রাসীঙ্গ বলে একটি দেশ রয়েছে। সেই দেশের পুর্বে গঙ্গারিডই বলে আরো একটি দেশ আছে। গঙ্গারিডই রাজ্যের অধিপতি মহাপরাক্রমশালী। তার ক্ষমতা আর রণহস্তীর কথা শুনে আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী আর এগিয়ে যেতে সাহস পেলো না। (পৃ: ২৪)।
আলেকজান্ডার বঙ্গদেশের কথা শুনে ভীত হয়ে আর এগোলেন না। বঙ্গবাসির গৌরবের কথা সন্দেহ নেই। পড়তে থাকুন-
আলেকজান্ডারের সাথে প্রাচ্যভুমির অভিযানে এসেছিলেন টলেমী। তিনি ছিলেন ভূগোলবিদ। ১৫০ খ্রিষ্টাব্দে টলেমী নিম্ন গঙ্গার একটি বিবরন লিখেছিলেন।
না থেমে পারা গেল না। খ্রীষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডারের সাথে এলেন টলেমী, তারপর ১৫০ খ্রিষ্টাব্দে গঙ্গার বিবরন লিখলেন। এই টলেমীর আয়ু কি হাজার বছর ?
পড়তে থাকুন। আরো কয়েক পাতা।
প্রাচ্যরাষ্ট্রের সম্রাট নন্দের সন্মিলিত শক্তির ভয়ে ভীত হয়ে আলেকজান্ডার পুর্বভারত অধিকারের স্বপ্ন ত্যাগ করেন। তিনি ফিরে যান। (পৃ: ৪৫)
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের বহুরকম ব্যাখ্যা ইতিহাসের বহু যায়গায় পাওয়া যাবে। এনিয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে। একটা বিষয়ে সম্ভবত সকলে একমত, আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ থেকে ফিরে যাননি, ফিরে গেছে তার লাশ।
বঙ্গ দেশের ঐতিহ্যময় ইতিহাসের কখন শুরু সেনিয়েও আমার কোন আপত্তি নেই। লেখক ৭৫ মিলিয়ন বছর উল্লেখ করেছেন, তার সত্যমিথ্যা যাচাই করার জন্য কোন টলেমি তখন ছিলেন কিনা সেটা তিনি বলতে পারবেন। সম্ভবত এই গভীর তত্ত্ব জানার জন্য কেউ এই বই হাতে নেবে না। যাদের এবই পড়ার সম্ভাবনা তাদের বোধগম্য বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকি।
গৌতম বুদ্ধ জীবিত থাকার সময়েই বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার শুরু হয়। নির্বানের দিন তিনি নিজে বলে গেছেন, বাংলার রাজকুমার বিজয় আজ সিংহলে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। সিংহলে আমার ধর্ম চিরস্থায়ী হবে। (পৃ: ৫৪)
বুদ্ধের সাথে বাংলার কতটা আত্মিয়তা তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে কিন্তু তিনি নিজের মুখে যখন বলে গেছেন তখন তার কথার অন্যথা হতে পারে না। তবে লেখক থামলেন না। তিনি বাংলার গৌরব প্রচার করবেনই করবেন। আবারও এল বাংলার সিংহল জয়ের কথা।
বাংলার সন্তান বিজয় সিংহল জয় করেছিল সেটা বুদ্ধের জন্মেরও আগের ঘটনা।
বাপরে। বুদ্ধের নির্বানের দিন তাহলে বুদ্ধের জন্মের আগের ঘটনা।
আমার পক্ষে আর এগোনো সম্ভব হল না।
নিজের ছোটবেলার কথা আমার স্পষ্ট মনে পরে। কিশোর বাংলা নামে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হত। দুপুরে আড়াইটা-তিনটার দিকে পৌছুত লাইব্রেরীতে। আরো ঘন্টাখানেক আগে গিয়ে অপেক্ষা করতাম সেখানে। যে সামান্য কয়েকটা কপি আসত তা বিক্রি হয়ে যেত সাথেসাথেই। কোনভাবেই যেন আমার কপি হাতছাড়া না হয়। সেই পত্রিকা ছিল একটা অদ্ভুত জগত। অনেক আকর্ষনের মধ্যে একটি ছিল এই লেখকের ধারাবাহিক রচনা, রূপালী ফিতে। চলচ্চিত্র নিয়ে চমৎকার লেখা। চলচ্চিত্রের আবির্ভাব, ইতিহাস থেকে শুরু করে কতকিছুই না শিখেছি সেখানে।
বই হিসেবে দেখে হাতে না নিয়ে পারা গেল না। পড়তে শুরু করলাম। কয়েক পাতা, তারপরই হোচট। আরিস্তোতঁল এর গুনকীর্তন করছেন তিনি। কিভাবে ম্যাজিক লন্ঠন দিয়ে চলচ্চিত্রে সুচনা করলেন তার বর্ননা;
বিশ্ব বিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডারের গুহ শিক্ষক ছিলেন আরিস্তোতঁল। আরবীতে তাকে আফলাতুন নামে ডাকা হত। অনেক ব্যাপারে ছিল তার কৌতুহল। তার আমলে ম্যাজিক লন্ঠন গ্রীসে খুব জনপ্রিয় হয়। সন্ধ্যে হলেই সেই আমলে লোকেরা ম্যাজিক লন্ঠন জালিয়ে ছবি দেখতে বসত। (পৃ ৩)
ছোটবেলা যখন পড়েছি তখন বিষ্মিত হয়ে ভেবেছি লেখক কত জ্ঞানী। কতরকম তথ্য, কতরঙের উপমা। এখন চোখে সেই রঙ নেই। আমি যতদুর জানি পবিত্র কোরানে আফলাতুন নামে যে জ্ঞানী ব্যক্তির কথা লেখা রয়েছে তিনি এরিষ্টটল নন, প্লেটো। আরবী ভাষায় প এর উচ্চারন হয় ফ এর মত, এবং সন্মানিত ব্যক্তিকে সন্মান দেখানোর জন্য অনেক সময় শুরুতে আলিফ যোগ করা হয়। সেকারনেই প্লেটো হয়ে গেছেন আফলাতুন।
আবারও পড়া ছাড়তে হল। ভাবনা পেয়ে বসল লেখক আসলে কি করতে চেয়েছেন। সারা বিশ্বের সব তথ্য হাজির করতে চেয়েছেন। সবাইকে জ্ঞানী বানাতে চেয়েছেন। নাকি দেখাতে চেয়েছেন তিনি নিজে কত জ্ঞানী, কতরকম খবর রাখেন, দেশকে-জ্ঞানকে কত ভালবাসেন। বাংলার রূপ বর্ননার জন্য ডজন ডজন বিশেষন ব্যবহার করতে হয়। এভাবেই নতুনত্ব আনতে হয়।
তিনি সফলও হয়েছেন। তার নাম শুনে প্রশংসায় পঞ্চদশমুখ গুনীসমাজ। এমন বিশেষন আর কেউ ব্যবহার করেনি। এসব তথ্য আর কেউ হাজির করেনি। এমন গুনিজন আর হয় না। প্রকাশক জেনে যায় লেখকের নামেই বইয়ের কাটতি। একজন অভিভাবক উল্টেপাল্টে দেখেই বই তুলে দেবে সন্তানের হাতে। ভেতরে কি আছে দেখবে না।
কিন্তু আমার ভাবনা অন্যখানে। যেসব মহাজ্ঞানী ব্যক্তিরা এই বই হাতে পেয়েছেন তারা কি একবার লক্ষ্য করেননি কি লেখা রয়েছে এতে। নাকি দেশের প্রশংসা এবং জ্ঞানের নমুনা দেখে না পড়েই সেলফে সাজিয়ে রেখেছেন। তারা তা করতে পারেন। তাতেও আমার আপত্তি নেই। কারো ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমার সত্যিকারের আপত্তি যাদের উদ্দেশ্য করে এই বই লেখা সেখানে। যে কিশোর বয়সীরা এটা পড়বে তাদের চোখে অনেককিছু ধরা পড়বে না। একসময় আমারও পড়েনি। তার ফল কি হবে। কি হচ্ছে।
একটা জাতি ক্রমেই মুর্খতার শিখরে উঠছে, কাল্পনিক, আজগুবি, উদ্ভট বিষয় নিয়ে অহংকারে গর্ব করছে। এমন দেশ হয় না, এমন মানুষ হয় না এই কথা বলেই সন্তুষ্ট। কুয়োটাকেই পৃথিবী জ্ঞান করছে। এককালে আমাদের এই ছিল, আমার আর কিছু দরকার নেই। এই বিষয় নিয়ে ইতিহাসের বই নেই এমন তো নয়। নিহাররঞ্জনের উল্লেখ করা হয়েছে এই বইতেই, তার কিশোর সংস্করন করে গেছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাকে উদ্ভট তথ্যের আশ্রয় নিতে হয়নি।
দেশের প্রসংশা সব দেশের মানুষই করে। সেটা সবার অধিকার। দেশপ্রেমের কারনেই মানুষ নিজের জীবন দিতে কুন্ঠাবোধ করে না, ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিয়ে রাতদিন কাজ করে। অনেক সময় সেটা সমাজের দৈনন্দিন প্রয়োজনকেও ছাপিয়ে যায়। দুঃখ করে ভার্জিনিয়া উলফ দেশপ্রেমের বই সম্পর্কে বলেছেন তাদের লেখা গুরুত্বপুর্ন কারন তারা দেশের কথা বলে, যুদ্ধের কথা বলে, বীরত্বের কথা বলে। আমার লেখা গুরুত্বপুর্ন না কারন আমি ড্রইংরুমে বসা মহিলার কথা বলি। তারপরও তার দেশ উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত। শীর্ষস্থানে থেকেও তারা আত্মসমালোচনা করে, প্রতিমুহুর্তে নিজেদের সংশোধন করে। একথা প্রচার করে না কোটি বছর আগে আমাদের অমুক ছিল সেকারনে আমরা গর্বিত জাতি।
একটা প্রজন্মকে মুর্খ বানানোর এই অপরাধের ক্ষমা হয় না।
0 comments:
Post a Comment