অনেকে বলে ধানমন্ডিতে ঠিকানা খোজা খুব সহজ। যদি রাস্তার নাম্বার এবং বাড়ির নাম্বার জানা থাকে।
ভুক্তভোগি জানেন বিষয়টি আসলে কি। আপনাকে একজন বলল ১৪ নম্বর রোডে ২৮ নম্বর বাড়ি। আপনি ভাবলেন আগে ১৪ নম্বর বের করি তারপর ২৮ নম্বর বের করা যাবে। রিকসায় উঠলেন। সে রওনা হল ১৪ নম্বরে। যেখানে নিয়ে গেল সেখানে ২৮ নম্বর বলে কোন বাড়ি নেই।
ব্যাপার কি!
জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন একে-ওকে-তাকে। শেষেমেশ যা জানতে পেলেন তা হচ্ছে এটা একসময় চৌদ্দ ছিল, এখন একে বলে ৭-এ। তবে যদি রাস্তা পার হন তাহলে ওপাশে ১৪ পাবেন। ওটার নাম বদল হয়নি। যেমন হয়নি ১৫ নম্বর বাসষ্ট্যান্ডের, কিংবা ৩২ নম্বরের।
কত নম্বর রোড বললেন ? ১৪ ? ১৪ না ১৪-এ ? ঠিক কইরা কন। ১৪ হইলে প্রথমে যাইবেন সোবহানবাগ। সেইখানে লাল রঙের একটা মসজিদ আছে না, রাস্তার উপর, ওইডার পাশের রাস্তা হইল ১৪। রিক্সায় ১৫ টাকা ২০ টাকা নিব। আর যদি ১৪-এ হয় তাইলে এইখান থিক্যা গুনতে গুনতে যান। সাতের-এ, আটের-এ, নয়ের-এ এমনে। ওইযে বাংলাদেশ মেডিকেল আছে না, ওইখানে।
আরেক ধরনের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটে। সাত (গম্বুজ) মসজিদ রোডের ধারে এসে শুরু হয় রিক্সাচালক-যাত্রীর তর্কাতর্কি। রিক্সাচালক বলে যামু না ওইপারে। আপনে সাতের-এ কইছেন, আইছি। যাত্রী যুক্ত দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করে, ওপারেও সাতের-এ। এটা সাতের-এ হলে ওটাও সাতের এ, ওটা চৌদ্দ হলে এটাও চৌদ্দ।
তবে কথা হচ্ছে, অমানুষিক পরিশ্রম করতে করতে কেউ যদি যুক্তিবোধ বিবর্জিত অমানুষ হয় তাকে কতটা দোষ দিতে পারেন। আপনার উচিত রাস্তা পার হলে চৌদ্দতে গেলে তাকে অতিরিক্ত টাকা দেয়া, নয়ত এপারে সাতের-এ নেমে হাটা দেয়া।
রাস্তার নামকরন কবে শুরু হয়েছিল প্রত্নতত্ত্ববিদ ভাল বলতে পারবেন। তারা বলেন মহেঞ্জেদারোতে নাকি পানি সরে যাওয়ার জন্য ড্রেনের ব্যবস্থা ছিল প্রতিটি বাড়ির পাশ দিয়ে। রাস্তার নাম দেয়ার ব্যবস্থা নিশ্চয়ই ছিল। নইলে মানুষ চিনবে কিভাবে। আপনার যদি নাম না থাকে তাহলে পরিচয় দেবেন কিভাবে ?
সেকারনেই নাম প্রয়োজন। ধানমন্ডি এবং অন্যান্য যায়গারও নাম প্রয়োজন। নাম্বার যথেষ্ট না। আইনে বলে নাম্বার নাকি নিজের নামে রেজিষ্ট্রি করা যায় না, নাম করা যায়। যেমন মাইক্রোসফট, কোকাকোলা এগুলো রেজিষ্ট্রি করা নাম। ওগুলো তাদের সম্পত্তি। যদি মালিকানা চান তাহলে নাম থাকতে হবে, নাম্বারে চলবে না। ধানমন্ডি হলেও। সেকারনেই প্রয়োজন হল নতুন নামফলক। সাদা মার্বেল পাথরে খোদাই করা নাম। সহজে হারানোর ভয় নেই। মুক্তিযোদ্ধা, খেলোয়ার, ভাষাসৈনিক এদের নাম সোভা পেতে শুরু করল রাস্তার মোড়ে মোড়ে। যিনি এই নামকরনের মহান দায়িত্ব নিয়েছেন তার নামটি প্রতিক্ষেত্রেই বিদ্যমান। নইলে তাকেই বা চিনবেন কিভাবে। অবশ্য তার নাম ছোট করে, নিচের দিকে।
হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় ছিলেন ৯ বছর। এই সময়ে বহুকিছুই করেছেন। অনেকে এখনো সেই স্মৃতিচারন করে বলেন যাকিছু করার তিনিই করে গেছেন। দেশ শাসন করেছেন, কবিতা লিখেছেন, আরো কতকিছু। এই কতকিছু করার মধ্যে একটি বিশেষ কাজ ছিল, নিজের নাম লিখে যাওয়া। যেখানে-সেখানে নিজের নাম লিখে গেছেন তিনি। এরশাদ ষ্টেডিয়াম, এরশাদ স্কোয়ার, এরশাদ উদ্যান, যাকিছুতে নাম লেখা সম্ভব লিখে গেছেন। পত্রিকায় ছবি বেরিয়েছিল একটি গনসৌচাগারের ছবি। কেউ একজন সেটার নাম রেখেছে তার নামে।
তবে দুঃখের কথা তিনি নাম টিকিয়ে রাখতে পারেননি। গদি ছাড়ার সাথেসাথেই দেখতে দেখতে উধাও হয়ে গেছে। তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন আবারো নাম দেয়ার ক্ষমতা হাতে পাওয়ার।
তার দেয়া নাম বদল হয়েছে অনেক আগেই। প্রায় দুই দশক। সেই নামবদল প্রক্রিয়া থেমে নেই। সেটা ঘটমান বর্তমান। রাস্তাঘাট (ঘাট শব্দটা বাদ দেয়া উচিত, কারন নদী-পুকুর এসব যদি না থাকে তাহলে ঘাট থাকবে কোথায়। অকারনে একে বয়ে বেড়ানোর কোন মানে হয় না। গাড়িঘোড়া শব্দটির ব্যবহার নিয়েও নতুন করে চিন্তা করা উচিত।এসব ঘাট-ঘোড়া এসবের বদলে স্মরনীয় কোন ব্যক্তির নাম ব্যবহার করা যেতে পারে।), স্কুল-কলেজ-হোষ্টেল, খেলার মাঠ সবকিছুরই নয়া নামকরন করা উচিত। যারা স্মৃতির অতীত তাদের নাম প্রচারের প্রয়োজন কি ? ভুলে যাওয়া ব্যক্তির নামে নভোথিয়েটার, এর কোন মানে হয় ? কিংবা ষ্টেডিয়াম ? এমন নাম হতে হয় যা প্রতিদিন জপ করা প্রয়োজন। সব ধর্মেই বলে জপ করতে। যত জপ করবেন তত পুন্য। এইসব উটকো নামটাম বাদ দিয়ে জপ করা যায় এমন নাম জুড়ে দিন।
আরেকটা কথা, ওইসব মৈত্রী-ত্রৈত্রী কোন নাম হয় না। নাম হবে ব্যক্তির নামে। বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র এটা কোন নাম হয় না। ওটাও ব্যক্তির নামে হবে।
0 comments:
Post a Comment