লোকটাকে দেখে আমার যা মনে হয়েছিল তাকে এককথায় বলা যায় হাবাগোবা। বছরখানের বয়সের ফুটফুটে এক ছেলে নিয়ে ঘুরছে। চোখেমুখে তৃপ্তি। তবে হাবাগোবার লক্ষনটিও পরিস্কার। আমি যখন দোকান থেকে চায়ের কাপ হাতে নিচ্ছি তখন আমাকে ধাক্কা দিয়ে পাশে এসে দাড়াল। দোকানের বাক্সটার এতটাই কাছে গিয়ে দাড়াল যে আমার মনে হল সম্ভব হলে তার ওপর পা দিয়ে আরেকটু ভেতরে যাবে। যদিও তার সেখানে যাওয়ার কোন কারন দেখিনি।
যখন দুরে সরে এসে দাড়িয়ে চা খাচ্ছি তখন আরেকবার এসে ধাক্কা মারল। আমি বিরক্তি দেখাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে আমার অস্তিত্বই টের পায়নি। আরো বারতিনেক সে একই কাজ করল। এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে সেদিক। একে ধাক্কা দেয়, তাকে গুতো দেয়। অথচ তার মুখ নির্বিকার। হাবাগোবা ছাড়া অন্যকিছু হতেই পারে না।
এদিকে শিশুটির চোখ গেছে দোকানে ঝুলে থাকা হলুদ রঙের কলার দিকে। আমি ভাল করেই জানি এই ফল দেখতে যতই আকর্ষনীয় হোক, খেতে মজা নেই। কেমিকেল দিয়ে পাকানো। শিশুটির তা জানার কথা না। হয়ত তার হাবাগোবা বাবারও।
সে আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে একটা কলা ছিড়ে তার হাতে দিল। শিশুটি সাথেসাথে হাত বাড়াল নেয়ার জন্য। কিন্তু কলা তার হাতে গেল না। কারন সে বামহাত বাড়িয়েছে।
লোকটি বলল, 'ডানহাত-ডানহাত।'
কোনহাতেই শিশুটির আপত্তি নেই। কলা পাওয়াই তারকাছে মুখ্য। সে ডানহাত বাড়িয়ে কলাটি আয়ত্ত্বে নিল। আর তার পিতার মুখে ছড়িয়ে পড়ল স্বর্গের তৃপ্তি। এতক্ষনে তার চোখে পড়ল আমি পুরো বিষয়টা দেখছি। সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'ছোটকাল থিক্যা ভদ্রতা শিখাইতে হয়। তবে না মানুষের মত মানুষ।
নিশ্চয়ই তার মনে ছিল আমার দিক থেকে কিছু শুনবে। কিন্তু উত্তরে যা শুনল তাতে হাসিটা মিলিয়ে গেল চুপসানো বেলুনের মত। ঠিক আমার পাশ থেকে শোনা গেল, 'আপনের মত।'
পরিচিত গলা। ঘুরে দেখি রসিক আলী।
তার এমন বেরসিক কথা শুনে লোকটা দুঃখ পেয়েছে সন্দেহ নেই। আর কোনদিকে না তাকিয়ে সে সোজা মাথানিচু করে হাটা দিল।
রসিক আলীর জন্য আরেককাপ চা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, 'কথাটা তো ঠিক। ছোটকালেই সবকিছু শেখাতে হয়। দেয়ানেয়া ডানহাতে করতে হয়। অনেকে বামহাতে জিনিষ দেয়ানেয়া করলে অভদ্রতা মনে করে।
রসিক আলী বলল, 'এককালে মাইনসে কইত ঘুষ বামহাতে নেয়। তারমানে বামহাতের কাম হইল খারাপ কাম। অহন দুইহাতেই নেয়, তারমানে যেকোন হাত ব্যবহারই খারাপ কাম। ডান হাতও আমার, বাম হাতও আমার। কোন হাতে নিমু তাতে কার কি। অনেক দেশে হ্যান্ডশেক করে বামহাতে কারন হার্ট বামদিকে।
তাকে বাধা দিতে হল, 'আচ্ছা ডানহাত-বামহাতের বিষয় নাহয় যাকগে, ছোটবেলা শিখাতে হয় এটা তো ঠিক।
রসিক আলী বলল, 'কথাডা ঠিক। তয় কেডা শিখাইব সেইডা কথা। এই লোক যদি পোলারে মানুষের মত মানুষ বানাইতে চায় তাইলে তারমত আরেকজন হইব, আরকিছু না। উদাহরন দ্যাখবেন। ওইযে পোলাগুলান গাড়ি নিয়া ডিমডিম গান বাজাইত্যাছে তাগো পেশা কি কইতে পারেন ?
আমি একনজর দেখলাম। এই বয়সে এদেশে একটামাত্র পেশাই থাকে, ছাত্র। তবে রসিক আলী আমার উত্তরের অপেক্ষা করল না। নিজে থেকেই বলল, 'অগো বাপে-মায়েও মনে করে তাগো পোলা একসময় নিউটন-আইনষ্টাইন হইব। নিদেন পক্ষে বিল গেটস। সেই সুযোগ কইরা দিতাছে। গাড়ি দিছে, জল-পানি-সিগারেটের ট্যাকা দিছে। তারপর কইছে যাও বাবা টাংকি মার গিয়া। মানুষের মত মানুষ হও। আমি কোটি কামাইছি, তুমি হাজার কোটি কামাইবা। আপনে পোলাগুলানের ওপর বিরক্ত হইতে পারেন আমি হইনা। ক্ষমতা থাকলে অগো বাপে-মায়েরে রাস্তায় কান ধইরা ওঠাবসা করাইতাম।'
আমি বাধা দিলাম তাকে, 'আপনি রেগে যাচ্ছেন।'
রসিক আলী বলল, 'না- রাগি নাই। এইডাই সত্য। আপনে নিজে চুরি-চামারি করবেন আর আশা করবেন ট্যাকা দিয়ে যারে রাখছেন, যে ইসকুলে পাঠাইছেন তারা আপনের পোলারে আইনষ্টাইন বানাইব এইডা পাগলের চিন্তা। এইডা কহনো হয় নাই, হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। আপনার পোলা যহন জানে আপনে ক্যামনে ট্যাকা কামান, সে সেইডাই শিখব। সেইদিন দেখলাম একজন পোলারে লইয়া বই কিনতে গ্যাছে। দোকানদাররে জিজ্ঞাস করে, শিক্ষামুলক বই কি কি আছে দ্যান। এই গাধারে কি আপনে বুঝাইতে পারবেন পোলাপান বই পড়তে শেখে যদি বাপ-মায়েরে পড়তে দ্যাখে তাইলে। যে পোলারে ধমক দিয়া পড়ার টেবিলে পাঠাইব আর নিজে বসব টিভির সামনে তার পোলা বই পড়ে না।
'হুঁ। আপনি তো বড় ভাবনায় ফেলে দিলেন। কি করা যায় বলুন তো।'
ভাবতে চাইলে ভাবতে পারেন, 'তয় বাস্তবে কি হইব কইতে পারি না। একবার চিন্তা করছি একটা কোচিং সেন্টার খোলার। পোলাপানগো লাইগা না, পোলাপানগো বাপ-মায়ের লাইগা। পোলাপানের সামনে ক্যামনে চলতে হয় সেইডা শেখার কোচিং। তয় সাহস পাই না। চারিদিকে কোচিং সেন্টারের যে রমরমা ব্যবসা, ইসকুল-কলেজ-ভার্সিটি, সরকার পর্যন্ত তারা কন্ট্রোল করে। কারো সাধ্য নাই মুখ খুইলা কয়, কে কতটা জানে তার পরীক্ষা তো দিছে, সেই রেজাল্ট দেইখা ভর্তি নিমু। সেইডা করলে কোচিং ব্যবসা চলে না। সেই একই ভয়। বাপ-মায়ে নিজেরাই যদি পোলার লেখাপড়ার খোজ নিতে শুরু করে তাইলে কোচিং করব ক্যাডা। ভয় হয় এইডা করতে গেলে একেবারে লাশ ফালাইয়া দিব।
চারিদিকে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ বিজ্ঞাপন দেখে আমার ধারনা ছিল কোচিং সেন্টার করা বোধহয় সহজ। এখন মনে হচ্ছে রসিক আলীর কথাই ঠিক। আয়-রোজগারের পথে বাধা তৈরী করলে খুন করা তাদের অধিকার। চাদাবাজরা হরহামেসাই একাজ করে। তাদেরও নিজস্ব হিসাব-কিতাব আছে। এধরনের কোচিং সেন্টারের নিরাপত্তা কেউ দেয়নি।
0 comments:
Post a Comment