বুশ-ব্লেয়ারের কল্যানে বাগদাদের কথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌছে গেছে। শুধু বর্তমান কেন, অতীতে সেখানে কি ছিল সেকথাও। ৮ হাজার বছর আগে সভ্যতার শুরু হয়েছে সেখানেই। ব্যাবিলনের শুন্যোদ্যান নামের বাগানে নাকি পানি দেয়া হত এক ধরনের যন্ত্র দিয়ে যাকে আমরা চিনি আর্কিমিডিসের স্ক্রু নামে। অথচ আর্কিমিডিসের জন্ম তারো হাজার বছর পর। যে চাকার জোরে সারা পৃথিবী চলছে সেটাও নাকি তারা তৈরী করেছে। কিন্তু এসব পুরনো কথা। নতুন কথা হচ্ছে মাটি খুড়ে সেখানে পাওয়া একটা মাটির পাত্র এবং একটা তামার পাত। গবেষকরা গবেষনা করে বলছেন ওই পাতটা আসলে ইলেকট্রড। এত সুন্দরভাবে তামা-দস্তা দিয়ে অন্যকিছু হতেই পারে না। পাত্রটার মধ্যে ভিনিগার রেখে পাতটা ডুবিয়ে বিদ্যুত তৈরী করা হত। কাজটি আরো কয়েক হাজার বছর পর ভোল্টা নতুনভাবে আবিস্কার করতে পারেন, কিন্তু বিষয়টি তাদের জানা ছিল। তার নামও দেয়া হল, বাগদাদ ব্যাটারী।
আমাদের দেশে এমন কিছু আবিস্কারের সম্ভাবনা নেই। কাজেই আবিস্কর্তা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। সত্যি বলতে কি, আগের ইতিহাস খোজার জন্য মাটি খুড়তে গেলে কেচো খুড়তে সাপ পাওয়ার বিষয় ঘটার সম্ভাবনা। আর কার যায়গা খুড়বেন ?
তারচেয়ে বরং মাটি না খুড়ে বাগদাদ ব্যাটারীর মত কিছুর সন্ধান করা যেতে পারে। আর ঢাকা শহরে প্রাচীন বলতে টিকে আছে একটামাত্র যায়গাই। শায়েস্তা খার লালবাগ কেল্লা। এরও নামের সাথে যখন বাগ আছে তখন কিছু না কিছু পাওয়া যাবেই। সেই আশায় গমন।
সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মত। মানুষজনের হুড়োহুড়ি নেই, বাড়ি-গাড়ী ঘাড়ের ওপর উপচে পরছে না। চারিদিকে মনোরম মনোহর পরিবেশ। সবুজ ঘাস, গাছপালা, পরিস্কার রাস্তা, তারমাঝে এখানে ওখানে কেল্লার ভবন। ভবন মানে পুরো যায়গার মাঝখানে তাজমহলের মত স্মৃতিসৌধ, একদিকে সোনালী রঙের মসজিদ, আরেকদিকে একটি দালান। এর নাম হামাম খানা নাকি হাম্মামখানা কি যেন। এখানে শায়েস্তা খা বসবাস করতেন নয়ত সুবাদারি করতেন। তার কথা ভেবে একটু কষ্টই হল। এত ছোট্ট বাড়িতে তিনি থাকতেন কিভাবে ? শুনেছি রিক্সা-স্কুটার কিনে সেগুলি ভাড়াদেয়ার ব্যবসা করেও অনেকে ছ‘তলার মালিক। কেউ বারো তলারও। সেতুলনায় তিনি নিতান্তই নগন্য ব্যক্তি ছিলেন। দেয়ালের বাইরে থেকে যে উচু উচু বাড়িগুলি উঁকি মারছে সেগুলি বোধহয় ব্যঙ্গ করছে তাকে।
কি বলবেন তিনি তাদের ?
তার সময় ছ‘তলা-বারোতলা বাড়ি তৈরীর প্রযুক্তি ছিল না। এটাই একমাত্র যুক্তি হতে পারে।
দেখলাম অন্য অনেকের সাথে কয়েকজন বিদেশীও ঘুরে বেরাচ্ছেন। আমিও ঘুরে বেরাতে শুরু করলাম। এদিক ওদিক হাঁটলাম, ঘাস-গাছপালা দেখলাম, মরচেধরা টিনের নোটিশ দেখলাম, নিয়মকানুন পড়লাম, দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে সেটা কতটা পুরু বোঝার চেষ্টা করলাম, কি দিয়ে তৈরী বোঝার কসরত করলাম। খুব সুবিধে হল না তাতে। কাউকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন। ঘুরতে ঘুরতে একজন ব্যক্তি দেখে কর্তাব্যক্তি মনে হওয়ায় তার কাছেই ধর্না দিতে চেষ্টা করলাম।
বললাম, ‘স্লামালেকুম, আপনি এই কেল্লার দায়িত্বে আছেন মনে হচ্ছে।’
তিনি দাঁত বের করলেন।
বললাম, ‘খুব সুন্দর করে সাজিয়েছেন। দেখে একেবারে নতুন মনে হয়।’
তিনি বললেন, ‘হে হে হে।’
আমি বললাম, ‘আপনাদের কর্মতৎপরতার প্রশংসা না করে পারা যায় না। ওই বিদেশীনি মনেহয় প্যারিস কিংবা হনুলুলু থেকে এসেছেন দেখতে।’
তিনি বললেন, ‘হে হে হে।’
আমি বললাম, ‘যারা এত কষ্ট করে এসব দেখাশোনা করছেন তাদের সবার নাম টাঙিয়ে রাখা উচিত।’
তিনি বললেন, ‘হে হে হে।’
আমি বললাম, ‘কেউ কেউ অবশ্য পুরনো দিনের কথাও জানতে চায়। সেগুলো একটা কাগজে ছাপিয়ে রাখলে হয়। যাদের দরকার তারা টাকা দিয়ে কিনে নেবে।’
তিনি বললেন, ‘হে হে হে।’
আমি বললাম, ‘আছে নাকি তেমন কিছু ?’
তিনি বললেন, ‘হে হে হে।’
এরই মাঝে আরেকজন এসে সঙ্গী হল। হে হে হে ভদ্রলোক আরেকবার হে হে হে বলে চলে গেলেন। নবাগতকেই আগের প্রশ্ন করলাম, ‘এই যায়গার ইতিহাস, এই জিনিষগুলোর বর্ননা লেখা কাগজপত্র কিছু আছে নাকি আপনাদের কাছে ? বিক্রির মত ?’
তিনি বললেন, ‘সে যারা গবেষনা করেন তাদের জন্য।’
বললাম, ‘সেই গবেষনার ফলগুলো ? সেগুলো দিয়েও তো কাজ চলতে পারে ?’
তিনি বললেন, ‘আপনি কোথাকার কে ? গবেষনা মানে বোঝেন ? এটা করতে মাথা লাগে। যাকে-তাকে দিয়ে হয় না।’
বললাম, ‘আমি গবেষনা করতে যাচ্ছি না। সেটা যাদের করার তারাই করুন না কেন। গবেষনা করে তারা কিছু একটা সিদ্ধান্ত তো নিয়েছেন। আমি সেটার কথা বলছি।’
তিনি বললেন, ‘আপনি আচ্ছা ত্যাদোর লোক দেখছি। আপনি কি ভাবেন গবেষনা কবিরাজী ওষুধের লিফলেট যে মোড়ে দাঁড়িয়ে হাতেহাতে বিলি করবে। নাকি জনসভার বিজ্ঞাপন যে রাস্তায় রাস্তায় সেঁটে রাখবে। এক গবেষকের লেখা আরেক গবেষকই বোঝে।’
লালবাগ ব্যাটারী খোজার চেষ্টা বাদ দিয়ে আমাকে কেটে পরতে হল।
0 comments:
Post a Comment