পরের চোখে দেখার সুবিধে অনেক। কষ্ট করে আয়নার সামনে দাড়াতে হয় না। যার অর্থ, লাইফ সাইজ আয়না কিনতে হবে না। আর আয়নার ওপরই বা ভরসা কি। বিজ্ঞাপনে দেখায় অমুক কোম্পানীর আয়না ব্যবহার না করলে ঠোটের লিপষ্টিক গিয়ে গালে লাগে। আয়নার ওপর নির্ভর করবেন কিভাবে?
কাজেই, নির্ভরতা পরের ওপর। কথায় আছে নিজের রুচি খাবেন, পরের রুচি পড়বেন। গরমকালে কোটটাই পড়ে থাকতে কিছুটা কষ্ট হতেই পারে। কিংবা শীতকালে শরীরের অর্ধেক বের করে রাখলেও। তবে যেহেতু পোষাক অন্যকে দেখানোর জন্য, অন্যের রুচি পুরন করার জন্য, সেহেতু এটুকু কষ্ট মেনে নেয়া কর্তব্য। সহজ কথায় পরের চোখে যা মানায় সেটাই পরিধান করুন।
পড়া বিষয়টি আবার জামাকাপড়, সার্টপ্যান্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বইপড়া বলেও একটা বিষয় থেকে যায়। সেখানেও পরের রুচিই ভরসা। স্কুলে পাঠ্যবইতে ইরেজি প্রবন্ধ পড়িয়েছে। লেখবের বক্তব্য ছিল, কাউকে কোন বই পড়তে দিলে বইটা ভাল না মন্দ এধরনের কিছু বলবেন না। ভাল বললে কথাটা তার মনে গেথে যাবে। বইয়ের মান যাই হোক না কেন তার মনে হবে সেটা ভাল বই। ভালনা বললে তাকে বোকা মনে করা হবে। আর খারাপ বললে যত ভালই হোক তারকাছে খারাপ মনে হবে। তারমানে, কাউকে বইতে দিন বইয়ের মলাট ছিড়ে। যেন লেখকের নাম পাঠক না জানতে পারে।
বাপরে! একশ পাতার বইয়ের দাম দেড়শ টাকা। মলাট ছিড়লে সেটা শোকেসে থাকবে কিভাবে ? আর মানুষ জানবেই বা কিভাবে অমুক বিখ্যাত বই চোখের সামনে রাখা। জানেন এক সপ্তাহে বইটার কয়টা এডিশন ছাপতে হয়েছে ? দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ কিনেছে আর আপনি এখনো কেনেননি। সমাজে মুখ দেখান কিভাবে ?
কাজেই, আপনার সমাজে মুখ দেখানোর ব্যবস্থা করা উচিত। ড্রইংরুমে সাজিয়ে রাখা উচিত। গাড়ির ড্যাসবোর্ডে সাজিয়ে রাখা উচিত। যদি একেবারেই সামর্থে না কুলোয় তাহলে একজনের পরামর্শ তার অগোচরে জানিয়ে দিতে পারি। কারো কাছ থেকে বইটা ধার করে এনে নীলক্ষেত থেকে প্রচ্ছদের রঙিন ফটোকপি করবেন, আর কিনবেন একই সাইজের একটা পুরনো বই। ব্যস, কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করলেই সাজিয়ে রাখার জন্য তৈরী।
এসব হচ্ছে পাঠকের কথা। লেখক যদি লেখে তবেই না পড়ার বিষয়টা ভাবা যায়। কাজেই লেখককে অবহেলা করা যায় না। পরের রুচি পড়া কথাটা যেমন সত্য তেমনি পরের রুচি লেখা কথাটাকেও অবহেলা করা যায় না। তাদের জন্যও কিছু পরামর্শ থাকা উচিত।
পাঠক যা পড়েন লেখককে তাই লিখতে হয়। উপন্যাসের যুগে কবিতা লিখে ফায়দা কোথায় ? নাটকের যুগে ডকুমেন্টারীর যা অবস্থা হয় তাই। তাছাড়া আজকাল কষ্ট করে কবিতার বই কিনতে হয় না। কবিতা শুনে প্রেমিকা খুশি হয় না। কবিতা উপহার দেয়ার নতুন পদ্ধতি বেরিয়েছে। কষ্ট করে পড়তেও হয়না। সার্টে-গেঞ্জিতে কবির ছবি আর কবিতা ছাপা আছে। গায়ে দিয়ে চলুন, যার যতবার খুশি পড়ে নিক। জীবনানন্দ হোক আর রবীন্দ্রনাথ হোক, এভাবে পুরো একটা কাবতা অনায়াসে পড়ানো যায়। পদ্ধতি একেবারে মন্দ না। নতুন কবি অনায়াসে এই পদ্ধতিতে জনপ্রিয়তা পেতে পারেন। কষ্ট করে বই না ছেপে কয়েকশ গেঞ্জি-পাঞ্জাবী ছাপলে বিক্রি এবং পরিচিতি দুইই সুনিশ্চিত। দেশে যখন সাহিত্যপত্রিকা বলে কিছু নেই। যেসব ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশোনায় মনোযোগ নেই তাদের জন্যও বিষয়ভিত্তিক পোষাক বানানো যেতে পারে।
বই পড়ার অন্য পদ্ধতি নিয়েও চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ নাকি এখন আর কষ্ট করে বই পড়ে না। মোবাইল ফোন, এমপিথ্রি প্লেয়ারে গল্প-কবিতা-উপন্যাস শোনে। সেক্সপিয়ার, টেনিসন থেকে ওবামা সকলের বই ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। যতদুর মনে পড়ে এক বাংলা উপন্যাসের সিডিও দেখেছি। প্রথমের পর দ্বিতীয়টা হয়নি দেখে ধরে নেয়া যায় ওই পদ্ধতি কাজে আসেনি। তবে বিকল্প পদ্ধতিতে এটা প্রয়োগ করা যেতে পারে। ইংরেজি কিংবা হিন্দী গানের মিউজিকের ওপর যেভাবে বাংলা কথা জুড়ে দেয়া হয় সেই পদ্ধতিতে। সমস্যা হতে পারে একটাই, কবির নাম প্রকাশ করা। দোকানে গিয়ে যেমন ক্রেতা বলে, শাহরুখ খানের এমপিথ্রি তেমনি কবিতা কিনতে গিয়ে বলতে পারে শাহরুখ খানের কবিতা।
যাই বলুক না কেন প্রচার করা দিয়ে কথা। অন্তত নিজের চোখের চেয়ে পরের চোখ যখন বেশি কাজে দেয় তখন সেটা ব্যবহার করতে আপত্তি কেন ?
0 comments:
Post a Comment