বিজ্ঞাপনের যুগ

Dec 15, 2009
ছোটবেলায় শুনতাম আমরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করছি। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে আবার ঘুমানো পর্যন্ত যাবিছু ব্যবহার করি সবই বিজ্ঞানের অবদান। এমনকি ঘুমানোর সময়ও বিজ্ঞানকে ছাড়া গতি নেই। এখন নিশ্চয়ই সেকথা কেউ বলেন না। যদিও আগের সবকিছুই সেভাবেই ব্যবহার করি। এখন বলা হয় বর্তমান যুগ হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির যুগ। হাতে, পকেটে, মাথায়, চোখের সামনে, কানের সাথে সবকিছু তথ্য ছড়াচ্ছে। আমরা সেই তথ্য গ্রহন করে তথ্যবিদ হচ্ছি। আগেকার যুগে মানুষ এত তথ্য ব্যবহার করত না।
ওরা একেবারেই অসভ্য ছিল। কোন নিয়মকানুন জানত না। যদিও রাষ্ট্রে সকল মানুষের অধিকার সমান একথা একজন বলে গেছেন কয়েক হাজার বছর আগে। ব্যাবিলনিয় সভ্যতার সময়। তখন কাগজ ছিল না, রীতিমত পাথরে খোদাই করে রেখে গেছেন। এবং বর্তমান যুগেও সেটা কাজে লাগেনি। সমাজ এখনো চলে মাছের নীতিতে। বড় মাছ ছোট মাছকে খায়।
তারপরও, তথ্য প্রযুক্তির যুগে তথ্য গোপন থাকে না। কে কাকে খেল জানা যায়। খাওয়ার পর যদি হজম না হয় তাহলে জানাজানি হয় আরো বেশি। আর যদি হজম হয়েই যায় তাহলে কথা নেই। নতুন খাদ্যের সন্ধানে চলে সেই মাছ। আরো বড় হয়। মাছ থেকে কুমিরে পরিনত হয়। তখন অন্যদের ধরাছোয়ার বাইরে চলে যায়। জরুরী আইনের সরকার বলেছিল তারা রুই-কাতলা ধরবে, পোনামাছ ধরবে না। কুমির ধরার কথা তারা বলেনি এবং সে চেষ্টাও করেনি।
আজকাল পাথরে কেউ কিছু লিখে রাখে না। তথ্য প্রযুক্তির যুগে সেটা বেমানান। বরং আধুনিক যন্ত্রপাতি আরো ভালভাবে সবকিছু ধরে রাখতে পারে। চোখে-কানে-নাকে সব যায়গায় পৌছে দিতে পারে নিমেশে। একবার না পারিলে দেখ বারবার। এই নিয়মে বারবার চোখে-কানে পৌছাতে থাকে। যতক্ষন না তা মস্তিস্কে খোদাই হয়। তারপর, আর বলা প্রয়োজন নেই। মগজ ধোলাই যখন হয়েই গেছে তখন যা বলা হবে সেটাই বিশ্বাস করবেন। যা করতে বলা হবে করবেন। যদি বলা হয় অমুক জিনিষ ভাল সাথেসাথে কিনতে ছুটবেন।
তথ্য প্রযুক্তির যুগে জীবন যাপনের জন্য এটাই মানানসই। সারাদিন বাইরে কাজ করবেন (যদি কাজ জোটে), তারপর বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া করবেন, তারপর গা এলিয়ে দিয়ে টিভির রিমোট চাপবেন। কতদিছু দেখা যায় সেখানে। দুনিয়ার এমন তথ্য নেই যা তথ্যপ্রযুক্তির দৃষ্টি এড়ায়। আর মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন। নিতান্ত বেরসিক হলে বলতে পারেন পুরোটাই বিজ্ঞাপন। খবর থেকে শুরু করে নাটক আর ডেইলি শো সবকিছু, একেবারে প্রতিটি সেকেন্ড দেখানো হয় কারো না কারো সৌজন্যে। তারা লক্ষ টাকা - কোটি টাকা দেয় এজন্য, কাজেই তাদের দুচারটে কথা শুনতেই পারেন। ছেলে-মেয়ে, পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে কথা বলার সময় কোথায়। ছেলেমেয়েদের জন্য কোচিং সেন্টার-স্কুল-কলেজ এসব তো আছেই। বিজ্ঞাপন ওরাও দেয়। কত নতুন নতুন কথা বলে। সব বিজ্ঞানসম্মত। যা করার ওরাই করে দেবে।
আপনি এখনও পুরনো ধারনা নিয়ে থাকলে বলতে পারেন বিটিভি হচ্ছে সরকারের প্রচারের বাক্স। সাহেব-বিবি-গোলাম কিংবা শুধু বিবি-গোলাম যা মনে আসে বলতে পারেন। তারা যা বলতে চায় সেটা প্রচার করাই কথা। এখন আর বিটিভি নিয়ে মাথা ঘামানোর কি আছে। রিমোট টিপুন, শতশত চ্যানেল। যা পছন্দ তাই পাবেন। একভাবে পছন্দ না হলে আরেকভাবে। খবর, নাটক, সিনেমা, গান, নাচ, খেলা। পিছনের ঘটনা একই, সেই বিজ্ঞাপন। দেখবেন আর পছন্দ করবেন কোনটা কেনা যায়। কত টাকা প্রয়োজন। কিভাবে তার ব্যবস্থা করা যায়। তারপর সকাল হলেই ছুটবেন।
এটাই জীবন। রাতে বিজ্ঞাপন দেখে বাছাই করবেন কোনটা প্রয়োজন, দিনে সেটা জোগাড়ের চেষ্টা করবেন। একদিনের পর আরেকদিন, তারপর আরেকদিন।
যুগের পরিবর্তন হয়। বিজ্ঞানের যুগ শব্দটার সাথে যদি ভাব ছাড়তে না পারেন তাহলে কষ্ট করে বিজ্ঞানকে বিজ্ঞাপন বানিয়ে নিন।

0 comments:

 

Browse