দাম হিসেব করা হয় টাকায়। জীবনের দাম কত টাকা ?
অনেকেই বলবেন ফালতু প্রশ্ন। প্রশ্নের বাকি অংশ কোথায় ? জীবনের ব্রান্ড কি, মডেল কি ? তবে তো দাম। মোবাইল ফোনের দাম কত এটা কি প্রশ্ন হল! দুহাজার টাকায় পাওয়া যায়, ৫০ হাজার টাকায়ও পাওয়া যায়।
জীবনের দামও তেমনই। ব্রান্ড এবং মডেল অনুযায়ী। নিতান্ত দার্শনীকতার খাতিরে বলতে পারেন জীবন দিনের মত। সকালে সুর্য ওঠে, দুপুরে মাঝগগনে থাকে, তারপর ঢলতে শুরু করে। একসময় অস্ত যায়। কোন অনিয়ম নেই। জীবন যখন সকালে শুরু হয়েছে তখন একসময় দুপুর বিকেল সন্ধ্যা হয়ে রাত আসবেই। প্রশ্ন তখনই ওঠে যখন দুপুরে সুর্য ডুবে যায়। কখনো কখনো সেটা ঘটে। বয়স ৩০ বছর হয়নি, হঠাত করে জীবন প্রদিপ নিভে গেল। গাড়ির ধাক্কায় কিংবা বিএসএফ কিংবা পুলিশের গুলির কথা বলছি না, একেবারে নিজের ইচ্ছেয়। গলায় ফাস লাগিয়ে।
একজন সেটাই করেছেন। পরিচয় তিনি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারী ৩৩ লক্ষের একজন। এক বছরের বেশি সময় ধরে স্লোগান দিয়েছেন (অন্তত চেষ্টা করেছেন), পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছেন। একসময় শেয়ার বাজারের রাস্তায় হাজির হয়েছে সাজোয়া গাড়ি। বিএসএফ যখন গুলি করছে, পুলিশ যখন মিছিলে গুলি করছে তখন এখানে করলে দোষ কোথায়।
ফল ওই গলার ফাস।
তার পরিচয় আরেকটু উল্লেখ করা প্রয়োজন। তার স্ত্রী রয়েছেন, রয়েছে ৪ বছরের এক সন্তান। মানুষ অনেক কিছুকে অত্যন্ত দামী মনে করে, সেগুলি পাওয়ার জন্য যতধরনের কষ্ট করা সম্ভব করে। ভিনদশে গিয়ে রোদের মধ্যে মরুভুমিতে গাছে পানি দেয়, বরফের মধ্যে রাস্তা পরিস্কার করে। নিজে না খেয়ে দেশে টাকা পাঠায়। সমস্ত কষ্ট সহ্য করলেও একটা কষ্ট সহ্য করে না, নিজের শিশু সন্তানকে কষ্টে রাখে না। মানুষ বলুন আর অন্য প্রানীই বলুন, নিজের সন্তানের চেয়ে প্রিয় কিছু নেই।
কিংবা অন্যভাবেই দেখতে পারেন। তিনি নিজে মরে নিজের স্ত্রী-সন্তানকে আরো বিপদের মধ্যেই তো ফেলে গেলেন। তাহলে এই মৃত্যুর সার্থকতা কোথায়। লাভ কার ? বেচে তো থাকা যায় কোনমতে। ৩৩ লক্ষ বিনিয়োগকারীর প্রতিদিনের গালাগালি আর অভিশাপ শুনেও যদি কারো মুখে সদাসর্বদা হাসি বিরাজ করে তিনি তো ভালভাবেই বেচে আছেন। সত্যি বলতে কি, সেটাই সত্যিকারের বেচে থাকা। আপনি মরলেন কেন ? শেয়ার বাজারে টাকা গেছে তো হয়েছে কি ? রাতের বেলা ছুরি হাতে অন্ধকার মোড়ে দাড়ান। সেটা করলেন না কেন ?
উত্তর হয়ত পাওয়া যাবে নিজের মৃত্যুর যার নিজের হাতে তাদের চরিত্র বিশ্লেষন করলে। কোন কোন দেশে, কোন এলাকায় মানুষ খুব সহজে আত্মহত্যা করে। একধরনের একরোখা মনোভাব কাজ করে তাদের মধ্যে। যদি সন্মান নিয়ে বাচতে না পারি তাহলে বেচে থাকব কেন ? একসময় তো মরতে হবেই। মরব তবু মাথা নিচু করব না। অসন্মান নিয়ে বাচব না। ১৯৭১ সালে বাঙালী সেকাজ করেছিল জাতিসুদ্ধ। অনেক দেশেই মানুষ করেছে, করছে, করবে। প্রান যায় যাক, সন্মান হারাব না।
আসলে মৃত্যু বিষয়টা এমনই যা অধিকাংশের মন খারাপ করে দেয়। দুপুর বেলা সুর্য ডুবে গেলে সেটাই স্বাভাবিক। সেকারনেই একজন দায়িত্বশীল নেতা মন ভাল করার ব্যবস্থা করেছেন। এই মৃত্যুর খবরের পাশেই ছবিসহ তার কৌতুক পরিবেশন করা হয়েছে। বিরোধীদল যখন সরকারের ব্যর্থতার কথা বলে তখনই মানুষ হাসে। আপনারও হাসুন। কাদবেন কেন ? হাসিই সেরা ওষুধ।
সরকারের কোন ব্যর্থতা নেই। শেয়ার বাজারে ব্যর্থতার প্রশ্নই ওঠে না। ওটা হাস্যকর কথা। যারা কর্তাব্যক্তি ছিলেন তারা এখনও কর্তাব্যক্তিই আছেন। দাম বাড়ার সময় শেয়ার বিক্রি করেছেন আপনারা কিনেছেন, কমের সময় আপনারা বেচবেন তারা কিনবেন।
একজন আত্মহত্যা করেছে ! ও নিয়ে মাথা ঘামানোর কি আছে ? দলে দলে তো মরেনি। আর মরলেই বা কি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দেশকে কলংকমুক্ত করা আর তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সরিয়ে সত্যিকারের গনতন্ত্র চর্চা করা, এসব তো হচ্ছে। এরপর সরকারের আর সময় কোথায়। গনতন্ত্র রক্ষা করা বলে কথা।
সেকারনেই এই ফালতু বিষয়ের অবতারনা। জীবনের দাম আসলে ওই ব্রান্ড হিসেবেই। ফেসবুকে একজনের মৃত্যুকামনা করলে জেলে যেতে হয়, আরেকজন মরলে সেটা নিয়ে কৌতুক তৈরী হয়। দুজনের জীবনের দাম কখনো এক হতে পারে না।
0 comments:
Post a Comment