ভলতেয়ার তার দেশের মানুষ সম্পর্কে বলেছিলেন তারা অতিমাত্রায় দাম্ভিক। অনেকটা খালি কলসি বাজে বেশি-র মত। যা নেই তাই নিয়ে বড়াই করে।
অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করে বলতে পারেন ভাগ্যিস বাংলাদেশে অলতেয়ারের মত কেউ নেই। থাকলে কি বলত কে জানে!
কিংবা ভিন্নকথাও হতে পারত। ভলতেয়ার আবার কে ? ওসব চুনোপুটি নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। বাঙালী বিশ্বসেরা। বাঙালী পারে না এমন কাজ নেই। কে বলেছে ? বাঙালী বলেছে।
বাংলা ভাষাকে বিশ্ববাসি চিনেছিল শতখানেক বছর আগে। একেবারে নিখুতভাবে বললে ৯৯ বছর আগে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পান। সারা বিশ্ব জেনেছিল বাংলা নামে একটা ভাষা আছে, সেই ভাষায় উন্নতমানের কাব্যরচনা হয়। বহুবছর পর্যন্ত মানুষ বাংলাদেশ এবং ভারতকে রবীন্দ্রনাথের দেশ বলে চিনত।
এরপর গঙ্গায় বহু পানি গড়িয়েছে (ফারাক্কার বাধ সত্ত্বেও)। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ সব যায়গায় কৃতিত্ব দেখিয়েছে বাঙালী। জ্বলে পুড়ে মরে ছাড়খার তবু মাথা নোয়াবার নয়, বলেছিলেন সুকান্ত। এমনকি নোবেল পুরস্কারও জুটেছে বাঙালীর ঘরে। দরীদ্রদের ঋন দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিস্ঠা করে পেয়েছেন একজন বাঙালী। আরেকজন বাঙালী পেয়েছেন মানবতার অর্থনীতির কথা বলে।
নোবেল পুরস্কার পাওয়া অসাধারন যোগ্যতা। তাদের নাম শুনলেই গর্বে মাথা উচু হয়ে যায়। সেইসাথে যখন তাদের মুখে শোনা যায় মানানসই কথা তখন মাথা আরো উচু করে বলতে হয়, নোবেল পুরস্কার তাদের মর্যাদা বাড়ায়নি, তাদের পুরস্কৃত করে নোবেল নিজেই ধন্য হয়েছেন।
বাংলাদেশ যখন তিন-উদ্দিনের শাসনে চলছে, চারিদিক থেকে সবাই নেতৃত্বে নতুন নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তখন বাংলাদেশে এসেছিলেন অমর্ত্য সেন। সত্যিকারের জ্ঞানীর মতই তিনি আগে আচ করেছিলেন তাকে কি প্রশ্ন করা হতে পারে। সরাসরি আগেই জানিয়ে দিয়েছেন রাজনীতি বিষয়ে কোন প্রশ্নের উত্তর তিনি দিবেন না।
এটাই তো সত্যিকারের যোগ্যতা। কোন বিতর্কিত বিষয়ে তিনি যাবেন না। দেশের নেতৃত্ব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব দেশের জনগনের।
একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অন্তত দুবার বাংলাদেশের সংবাদে উপস্থিত হয়েছেন। বাংলা একাডেমির দেয়া সন্মান নিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। নিন্দুকেরা কেউ কেউ বলেন তার উপস্থিতি আসলে উছিলা। একা প্রধানমন্ত্রীতে ডিগ্রী দিলে যদি সমালোচনা হয় তাই দোসর হয়েছেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশ কত উন্নতি করেছে সেকথা বললেন স্পষ্টভাবেই।
আরেকবার উপস্থিত হলেন একেবারে বাংলা ভাষা বিষয়ক অনুষ্ঠানে। এবারের বক্তব্য আরো স্পষ্ট, বাংলাদেশের চিকিতসা ব্যবস্থা ভারতের চেয়ে বেশি উন্নতি করেছে।
অবশ্যই। তিনি নিজে অসুস্থ হলে এপোলো কিংবা স্কায়ারে যাবেন নিশ্চিতভাবেই (প্রার্থনা করি তিনি সুস্থ থাকুন)। সেখানে গেলে মনে হবে বৃটেনের সাথে কোন পার্থক্য নেই। অন্তত বিল্ডিং, যন্ত্রপাতি, পোষাক, ভাষায় এবং খরচের হিসেবে। এই সুযোগকে যদি তুলনা করেন আসাম, ত্রিপুরা, পাঞ্জাবের সাথে এমনকি কলকাতার আগুনের ঘটনা ঘটনা হাসপাতালের সাথে তাহলে সেটা উন্নতি তো বটেই। তিনি নোবেল জয়ী না হয়ে সাধারন ব্যক্তি হলে কি ঘটতে পারে তার বাস্তব একটা উদাহরন দিতে পারি। পরিচিতি একজন তারা ষ্ট্রোকের পর বাবাকে নিয়ে গেলেন এমনই এক হাসপাতালে। তাকে রাখা হল লাইফ-সাপোর্ট দিয়ে। যতদিন তার টাকা দেয়ার সামর্থ্য আছে ততদিন। তারপর লাশ তুলে দেয়া হল। তার আফসোস এটুকুই, আমার দশলাখ টাকা গেছে যাক অন্তত আমার বাবাকে যদি জীবিত ফিরিয়ে দিত !
বাংলাদেশের ১৫ কোটি (সঠিক সংখ্যা জানা নেই) কতজন এধরনের হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে সেকথা না তোলাই ভাল। বরং তাদের সামথ্যের মধ্যে যা আছে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। তাদেরকে কিনতে হয় আটা দিয়ে তৈরী ট্যাবলেট, রং মেশানো পানির সিরাপ। মাঝেমধ্যে এদেরকে ধরাই হয় টাকার হিসেবে গড়মিল হলে। সে যারা ওগুলো প্যাকেটে ঢোকায় তারাই ধরা পড়ে, ওপরের দিকে যায় না।
অসুখের পেছনে কারন থাকে। সেই কারনটাও অজানা না। পানি থেকে শুরু করে সাক-সবজি-ফল-তেল কোনটাই ভেজাল ছাড়া নেই। সেখানেও ধরা হয়, জরিমানা করা হয়। ভেজাল কমে না, বাড়তেই থাকে। একে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে বিবেচনা করা যায় কি-না তা অবশ্য জানা নেই।
একটা বিষয় নিয়ে বিতর্কের সুযোগ তেমন নেই। বাংলাদেশের মানুষ অসুস্থ হলে যদি সামর্থ্য থাকে তাহলে ভারতে যায়। ভারত থেকে চিকিতসার জন্য বাংলাদেশের আসার কথা শোনা যায়না।
সাম্প্রতিক কালে সরকারদলীয় অতি উচু পর্যায়ের একজন নেতা সংসদে অভিযোগ করে বলেছেন তিনি তার এলাকায় হাসপাতালে ডাক্তার বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বলেছিলেন। মন্ত্রী বাড়ানোর বদলে চিকিতসক কমিয়েছেন।
অমর্ত্য সেন যখন বলেন বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে উন্নতি করেছেন তখন সরকার নিশ্চয়ই হাততালি দিয়ে বলবেন বাহবা, তাইতো, আমরা ভারতকে ছাড়িয়ে গেছি। এরপর ইউরোপ-আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে যাব। অন্য কোন সরকার পেরেছে এত সাফল্য দেখাতে!
সবাই অল্পের চেয়ে বেশি পছন্দ করে। সে যাই হোক না কেন। কিন্তু বস্তু যদি কথা হয়, এবং অমর্ত্য সেনের মত ব্যক্তির মুখ থেকে আসে তাহলে একসময় মনে হতে পারে, বেশির চেয়ে কম ভাল।
0 comments:
Post a Comment