রাজনীতির সাথে ক্রিকেট খেলার মিল খুবই বেশি। ইচ্ছে করলেই সব ভাল বলা যায়, ইচ্ছে করলেই সব মন্দ বলা যায়। ব্যাটসম্যান যদি খেলতে না পারেন তাহলে গুড বোলিং, যদি শট খেলেন তাহলে গুড শট, যদি ফিল্ডার ধরে ফেলেন তাহলে গুড ফিল্ডিং, যদি ধরতে না পারেন তাহলে গুড প্লেসমেন্ট। আবার ইচ্ছে করলেই বিপরীত কথাও বলতে পারেন। ব্যাড বোলিং, ব্যাট শট, ব্যাড ফিল্ডিং, ব্যাড প্লেসমেন্ট থেকে শুরু করে ব্যাড লাক পর্যন্ত। কাজেই ক্রিকেট একধরনের রাজনীতি।
অনেকে আবার বলেন আসলে রাজনীতির সাথে বরং নাটকের মিল বেশি। নাটকে যেমন একজন নাট্যকার থাকেন, সিগারেটে টান দিতে দিতে হিসেব করেন কে কখন কোথায় কি করবে (অনেকটাই ঈশ্বরের মত), পরিচালক যেমন সেগুলি ঠিকমত করা, অভিনেতা যেমন সেগুলি দিনরাত প্রকটিস করেন রাজনীতিও তেমনি। কিছু মানুষ ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে, কিছু মানুষ সেগুলি কাজে পরিনত করার দায়িত্ব নেয়।
বিশ্বে অনেক খারাপ ধরনের অপরাধ হয়। মানুষ সেটা জানে। সেবিষয়ে মুখ খোলে না কারন সবাই জানে সেটা অতীতে ঘটেছে, বর্তমানে ঘটছে আগামীতেও ঘটবে। ম্যাকবেথ শত্রুকে মারেননি সেকারনেই। জানেন শত্রু এভাবে শেষ করা যায় না। তারপরও মানুষের বক্তব্য, মানুষ সভ্য প্রানী। প্রতিদিন-প্রতি মুহুর্তে সভ্যতার নতুন নতুন সুত্র তৈরী হচ্ছে। একাজে পশ্চিমারা এগিয়ে। তারা অন্তত এটুকু শিখে, ওধরনের বিষয়গুলো কুটনীতির ভাষা প্রকাশ করতে হয়। আমেরিকায় একজনকে গরাদে পোরা হয়েছে কারন নাম দেখে বোঝা যায় সে মুসলমান। কাজেই টেররিষ্ট হতেই পারে। সাথেসাথে মুখে এটাও বলা হচ্ছে, এসব আসলে ইসলামের বিরুদ্ধে না, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। ইসলাম খুব ভাল ধর্ম, মুল ধর্মের সাথে সাথে সন্ত্রাসের কোন সম্পর্ক নেই।
ভারতীয় উপমহাদেশের নেতাদের ওসব বাধ্যবাধকতা নেই। তারা ঈশ্বরের মতই স্বাধীন। কথা ঘুরিয়ে বলেন না একেবারে সরাসরিই বলেন। যেমন বললেন ভারতের এক বিশাল মন্ত্রী প্রনব মুখার্জি, বিএসএফ সীমান্তে একজনকে উলংগ করে পিটিয়েছে, ওসব ঘটনা ঘটেই। ও নিয়ে মাথা ঘামানোর কি আছে।
সাথেসাথে প্রতিধ্বনি করলেন বাংলাদেশের আরেক মহান নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সরকার সীমান্ত নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয়। ওই ঘটনা নিয়ে সরকারের মাথা ঘামানোর কোন ইচ্ছে নেই।
আসলে ক্রিকেট খেলায় কিংবা নাটকে কেউ খারাপ করলে তিনি সেবিষয়ে মাথা ঘামাবেন না এটাই স্বাভাবিক। মাথা ঘামায় দর্শক। একজন মানুষকে উলংগ করে পৈশাচিক উল্লাসে পিটানো হচ্ছে দেখলে তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষ তাহলে কাকে বলে। এই মানুষই তো সিনেমায় একটা পাখির মৃত্যু দেখে চোখের পানি ফেলে। সেটাই তো মনুষত্ব। সে বাংলাদেশী না ভারতীয়, হিন্দু না মুসলমান, চোর না ব্যবসায়ী সে প্রশ্ন মানুষ করে না, এধরনের কিছু দেখলে প্রতিবাদ করে। একই ঈশ্বরের সৃষ্টি, তার ওপর মানুষ। সেখানে পশুর আচরন করার পরও অন্তত মুখে দুটো ভালকথা বলা যাবে না ? তারা নিজে মানুষ তো! তারা তো আবার জনগনের ভোটে নির্বাচিত। সেই জনগন তো এরাই। যারা পিটিয়েছে, যাকে পিটিয়েছে তারাই। নাকি তাদের শক্তি এতটাই বেশি যে তারা জানে এদের সাধ্য নেই তাকে ভোট না দিয়ে পালায়।
ব্যাখ্যা অবশ্য ভারতের এক বাংলা সংবাদপত্র দিয়েছে। ওটা আসলে আইএসআই এর ষড়যন্ত্র। ভারতে যদি বন্যা হয় সেটা পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র আর বাংলাদেশে যদি ঝড় হয় সেটা যুদ্ধাপরাধীদের বাচানোর ষড়যন্ত্র। পরেরটা এখনো বলা হয়নি। (ভুল হল, বলা হয়েছে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। ফেসবুক ব্যবহার করে দেশে ক্যু এর চেষ্টা করেছে দুজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আর একজন বর্তমান মেজর)।
বাংলাদেশে র্যাব আর ক্রশফায়ার যেমন সমার্থক শব্দ ভারতের জন্য বিএসএফ আর গুলি-নির্যাতন সমার্থক শব্দ। আজকাল ক্রশফায়ার যেমন গুপ্তহত্যায় পরিনত হয়েছে তেমনি বিএসএফ এর গুলির ঘটনা এখন পিটিয়ে নদীতে ফেলে দেয়ায় পরিনত হয়েছে। এটা ভারতের মানবতাবাদীদের বক্তব্য। সাধারনভাবে বাংলাদেশ থেকে ধরে নেয়া হয় ভারতের মানবতাবাদীরা চোখকান বন্ধ করে থাকেন। তারা যে সেটা করেন না এই ঘটনা তার প্রমান। ওই ঘটনার ভিডিও একটি টিভি চ্যানেলে দেখানো সম্ভব হয়েছে তাদের কারনে, সেখানে টক শোতে তারা বলেছেন তাদের চেষ্টা এবং তার ফলের কথা। সেকারনেই জানা সম্ভব হয়েছে তারা বোবা-কালা নন। বাংলাদেশে যেমন প্রতিদিন-প্রতি মুহুর্তে পুলিশী সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করা হচ্ছে সেটা তারাও করেন।
ফল একটাই। নেতারা জনগনের ম্যান্ডেট পেয়ে গেছেন। এবং তারা জানেন ম্যান্ডেট আবারও তাদের হাতেই আসবে। ঘুড়ির লাটাই তাদের হাতে।
ক্রিকেট বা নাটক যাই বলুন, সাধারন মানুষ সবখানেই দর্শক। হাততালি দেয়া অথবা গালাগালি করা ছাড়া তাদের আর কিছু করার নেই। যদিও দুধরনের কারবারই হয় তার পকেটের টাকায়। বরং একে ক্রিকেট বা নাটক না বলে ঘুড়ির ওড়ানোও বলতে পারেন।
0 comments:
Post a Comment