ফেব্রুয়ারী ভাষার মাস। ভাষার মাসে ভাষার জন্য কিছু করা হবে না তাও কি হয়। বাঙালী জাতি কি এতটাই নেমকহারাম!
আজকাল সরকার, প্রশাসন কিংবা জনগন কেউই দায়িত্ব পালন করে না। অনেক সময়ই আদালতকে নাক গলাতে হয়। রুল জারি করতে হয়। কাজেই ভাষার সন্মান রাখতে সেখানে কিছু করা হবে সেটাও হয় না। কাজেই, সংবাদপত্রের খবর;
হাইকোর্টের বেঞ্চ বেতার-দুরদর্শনে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে ব্যবস্থা নিতে রুল জারি করেছে।
খবরটি প্রথম আলোর। তারা মুহুর্তেই বুঝে গেছে রেডিও বলা যাবে না, বলতে হবে বেতার। টেলিভিশন বলা যাবে না, বলতে হবে দুরদর্শন। কে জানে যদি আদালত অবমাননার মামলায় পড়তে হয়। কথার একটু এদিক-সেদিক করলে যদি আম-ছালা দুইই বাচানো যায় তাতে দোষ কি ? সরকারও খুশি পাঠকও খুশি। লোকে বলে টাইম পত্রিকা এই নিয়মে ব্যবসা করে।
বাংলা ভাষার হাল কি, কোনদিকে যাচ্ছে এনিয়ে আগেও লেখা হয়েছে। অযাচিতভাবেই নিজের মত প্রকাশ করা হয়েছে। বরং সে বিষয় থাক। বিষয়টা অন্যভাবে দেখা যাক।
মানুষ শতশত বছর ধরে আলোচনা করছে গনতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্র নিয়ে। যতরকম কাটাছেড়া করা সম্ভব করেছে, আরো করছে। তারমধ্যে থেকে মুল যে কথাগুলি বেরিয়ে এসেছে তা হচ্ছে, গনতন্ত্রের মুল বৈশিষ্ট কথা বলা স্বাধিনতা। সবাই নিজের মত প্রকাশ করবেন স্বাধীনভাবে। তারমধ্যে যা ভাল সেটা গ্রহন করা হবে। আর স্বৈরতন্ত্রের মুল বৈশিষ্ট এর ঠিক বিপরীত। যার হাতে ক্ষমতা তিনি কথা বলবেন অন্যরা শুনে যাবেন। মুখ খোলা যাবে না। তাদের সবসময়ই সিজস্ব রেডিও-টিভি (সরি, বেতার-দুরদর্শন) থাকে। সেখানে তাদের কৃতিত্বের কথা প্রচার করা হবে। বর্তমান যুগে এগুলিও হাতছাড়া হয়ে ব্যবসায়িদের হাতে গেছে। তারা যেন বেফাস কিছু বলে না ফেলে সেকারনে কিছু ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এধরনের আইন দেশকে (ভাষার চেয়ে বেশি গুরুত্বপুর্ন) রক্ষা করতে পারে। আদালত চুপ করে থেকে দেশের ক্ষতি দেখতে পারে না।
সমস্যা হচ্ছে, বিকৃত বাংলা বিষয়টা কি ? বিকৃতির সংজ্ঞা কি ? সেটা কে নির্ধারন করবে ? ডক্টর শহিদুল্লার উল্লেখ করা ভাষাকে মুল বাংলা হিসেবে ধরা হবে এটাই সংগত। এর বাইরে যাকিছু সবই বিকৃত বাংলা। কেউ যদি স্থানিয় শব্দ স্থানিয় উচ্চারন ব্যবহার করে সেটা বাংলা। শালাকে শালা বলতে হবে, হালা বলা যাবে না। যদিও আঞ্চলিক ভাষার অভিধানও তৈরী করেছিলেন সেই শহিদুল্লাই। (আশ্চর্যজনকভাবে মানুষ অদ্ধুত ভাষা ব্যবহার করে। শালাকেও শালা বলে, শালার ব্যাটাকেও শালা বলে)। বিশুদ্ধ উচ্চারন চর্চ্চার এক উদাহরন দিতে পারি। পেশাগত কারনে এক সরকারী নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখতে হয়েছিল। সেখানে এক কৃষক একজন ডাক্তারের সাথে দেখা হওয়ায় সালাম দেয়ার জন্য বললেন, স্লামালেকুম। একজন বিশেষজ্ঞ তার প্রতিবাদ করে বললেন, ওটা পাল্টাতে হবে। লিখতে হবে আস সালামু ওয়ালাই কুম। এধরনের বিকৃতি সংশোধনের জন্যই কি নতুন আইন।
নাকি বাংলার সাথে অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করলে তাকে বিকৃত বাংলা বলা হবে। বিশেষ করে ইংরেজি। হিন্দী হলে দোষের কিছু নেই। বরং হিন্দী জানা থাকলে বলিউডি ছবি দেখতে সুবিধে হয়। পাশের বাড়ির ছোট মেয়েকে বলতে শুনেছি সে কাজের লোককে ডাকছে, মা ডাকে, তুমছে পেয়ার করবে।
ভাষাদুষনের জন্য দায়ী কে, ভাষাদুষন কিভাবে হয় এ নিয়ে গবেষনা কম হয়নি (ভিনদেশে)। সম্ভবত বৃটিশরা এবিষয়ে সবচেয়ে এগিয়ে। তাদের সিদ্ধান্ত কিংবা পদ্ধতিগুলি হয়ত বিবেচনা করা যেত, কিন্তু বিদেশীদের অনুকরন করলে কি মান থাকে ?
কিংবা কেউ যদি বলেন নজরুল ইসলামকে নিয়ে বক্তৃতা দেয়ার সময় অবধারিতভাবেই এসে যায় তিনি আরবি-ফারসি-উর্দু (তওবা) কেমন সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
কিন্তু, চৈত্র মাসের ফতোয়া চৈত্র মাসেই মানায়।
কিংবা প্রশ্ন তুলতে পারেন বাংলাদেশের সমস্ত আইন বাংলায় রূপান্তর করা হয়েছে বহু বছর আগে, আদালতে বাংলার ব্যবহার কোথায় ? আইনব্যবসায়ীরা বাংলা বলতে জানেন না। কেউ আধা ইংরেজি বলেন, কেউ পুরোপুরি।
খবরের মুল লাইনটা (লাইনের বাংলা কি হবে ?) আরেকবার পড়ে দেখুন তো। হাইকোর্ট, বেঞ্চ, রুল এগুলো কোন ভাষার শব্দ ?
অন্যের দিকে দৃষ্টি দেয়ার আগে নিজের পড়নে পোষাক আছে কি-না দেখে নেয়া কি প্রয়োজন ছিল না!
পুনশ্চ : এই সাইটে বহু ভুল বানান রয়েছে। সেজন্য লেখককে দায়ি করবেন না। সবাই জানেন কম্পিউটারে বাংলার মালিকানা কোন মহাপুরুষের।
0 comments:
Post a Comment