রাব্বানা আটানা ফির দুআনা দশ আনা, একে একসময় ফাউ ইনকাম বলা হত। সামনে হাত (অথবা থালা) বাড়িয়ে এধরনের কিছু কথা আওড়ালে পাওয়া যায়। একে ফাউ ইনকাম বলা যুক্তযুক্ত কিনা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
কেউ যখন সিড়ি বেয়ে চারতলায় উঠে বলেন হাটতে পারি না, সাহায্য দেন তখন আপনাকে মনে করতেই হয় কাজটা খুব সহজ না। হাটতে না পেরেও চারতলায় উঠেছে। হাটতে পারলে চল্লিশ তলায় উঠতেও আপত্তি ছিল না। রীতিমত কষ্ট করে আয়, একে ফাউ বলবেন কেন ?
একসময় অফিসেব বাড়ি আয় হলে তাকেও বলা হত ফাউ ইনকাম, কিংবা উপরি ইনকাম। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি এজন্য কত মেধা খরচ করতে হয়। বহু টাকা খরচ করে, নেতা-মন্ত্রী ধরে বসার যায়গা পেতে হয়। এগুলি অগ্রিম বিনিয়োগ। তারপর প্রতিনিয়ত চোখকান খোলা রাখা, কখন কোন ফাইল কতটুকু নড়ল, কার হাতে কত দিতে হবে সব জটিল জটিল হিসেব। নিউটনের ক্যালকুলাস এত জটিল হিসেব মিলাতে হিমসিম খেয়ে যায়। তাকে বলছেন ফাউ! এ-যে একেবারে রক্ত পানি করা আয়।
দোকানে একটা জিনিষ কিনলেন আরেকটাকে ফাউ হিসেবে পেলেন। আসলেই কি! আপনি কি আরেক দোকানে দেখেছেন ফাউ ছাড়া সেই জিনিষের দাম কত ? কিংবা হিসেব করেছেন কি ওই ফাউ দেয়ার জন্য কত পোষ্টার-ব্যানার, খবরের কাগজ-টিভিতে বিজ্ঞাপন দেয়ার খরচ কত ? আপনি ভাবছেন ফাউ দেয়ার জন্য সব খরচ করছে ?
আজকাল চাদাবাজও কোটি টাকা চেনে। মনে করতে পারেন এটা তাদের ফাউ ইনকাম।
জানেন কি এজন্য কত ইনভেষ্ট করতে হয়। কোন পুলিশ, কোন থানা, কোন নেতা সব হাতে রাখতে হয়। একেবারে মন্ত্রী পর্যন্ত। ধরা পড়লে গনপিটুনির আগেই পুলিশের হাতে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হয়, থানায় গেলে হাজতের আগেই ফোনের ব্যবস্থা রাখতে হয়। একে ফাউ বলছেন কোন হিসেবে ?
সত্যিকারের ফাউ একে বলে না। বরং এই উদাহরন দেখুন।
পথের দুধারে এখানে ওখানে হাজার হাজার ব্যবসায়ী বসে আছে একটা চেয়ার আর টেবিল নিয়ে। পকেটে মোবাইল ফোন না থাকলে (অথবা নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চাইলে) তাদের দুটাকা দিয়ে ১ মিনিট কথা বলতে পারেন। এতে অবাক হবে না, বাঙালী না খেয়ে থাকতে রাজী, কথাছাড়া থাকা যায় না। মোবাইল কোম্পানী দেশের প্রধান ব্রান্ড। সবচেয়ে বড় ট্যাক্সদাতা। সবচেয়ে বড় কোম্পানী।
যারা বসে আছে তারা ফোন করার সুযোগ শুধু এভাবেই দেয় না, টাকা শেষ হলে সেটা পুরন করার সুযোগও দেয়। আপনি এমনই এক দোকানে গিয়ে বললেন অমুক নাম্বারে ১০০ টাকা। তারপর নিজেকে যতবারই বলুন আর বাঙালীকে বিশ্বাস করছি না, তারপরও তার আঙুল চালানোর দক্ষতা দেখে ১০০ টাকা দিয়ে বিদেয় নিলেন। কিংবা আপনার মোবাইলে শব্দ হচ্ছে দেখে সেখানে কি লেখা পড়ার চেষ্টা করলেন না (অর্ধেকের বেশি মানুষ পড়তেই জানে না)।
ব্যস, হয়ে গেল তার ফাউ ইনকাম। ভাগ্য ভাল হলে দেখলেন ১০০ টাকার যায়গায় ১০ টাকা জমা হয়েছে। ভাগ্য খারাপ হলে দেখলেন শুন্য। তারকাছে ফিরে যেতে পারেন, ঝগড়া করতে পারেন, লোকজড়ো করতে পারেন। কথা হচ্ছে, তার বক্তব্য- আপনারে জীবনেও দেহি নাই। আর সমবেত জনতার বক্তব্য, আগে কি আন্ধা আছিলেন ? ধান্দাবাজি করতে আইছেন ?
ঘন্টাখানেক দরদাম করে রিক্সাভাড়া ঠিক করলেন। যায়গামত যাওয়ার টাকা টাকা দেয়ায় সে বলল, ভাংতি নাই।
এ অভিজ্ঞতাও আপনার আছে। চারিদিকে যখন ভাংতির কোন সুযোগ না থাকে তখনই একথা শোনা যায়। যদিও আপনি ভাল করেই জানেন তারকাছে একটা কেন অন্তত দশখানা ১০ টাকার নোট পাওয়া যাবে। চাইলে নিজের বক্তব্য প্রমান করার জন্য লোজ জড়ো করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলার জনতা সবসময়ই গরীবের পক্ষে। দশ ট্যাকার লাইগা হাউকাউ কইরেন না। যান গা।
ফাউ ইনকাম এবং ফাউ খাওয়া এদের এক থেকে আরেককে পৃথক করা কঠিন। আমি মহল্লার বড়ভাইয়ের কথা বলছি না কিংবা ছাত্রনেতার ক্যান্টিনে খাওয়ার কথা বলছি না। ওগুলো তাদের স্বিকৃত অধিকার।
ধরুন আপনি চায়ের দোকানে চা খাচ্ছেন। পাশ থেকে একজন এসে বলল, ৫ টাকা দিন তো!
আপনি ভাল করে তাকে দেখলেন। দিব্যি ফ্যাসনেবল পোষাক পড়নে যুবক। হাতে চায়ের কাপ।
কেন ?
একাপ চা খাইছি। দামটা দ্যান। পড়ে দিয়া দিমুনে।
আপনি ততক্ষনে আরেকটু ভালভাবে দেখেছেন। পোষাক বাপ-মার কাছ থেকে পেয়েছে বটে, হয়ত তিনবেলা খাবারও পায়। চেহারা বলে দিচ্ছে পকেটে চা খাওয়ার টাকা নেই। সেটা আয় করার সামর্থ্য নেই, সুযোগও নেই। এভাবে একজনকে ধরে যদি ফাউ চা খাওয়া যায়। পড়ে দিমুনে, কোন পড়ে কে জানে!
আপনি মনে করতে পারেন টাকা আরেকজন দেবে এত নিশ্চয়তা পেল কিভাবে ? অলরেডি চা নিয়ে অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে। না দিলে কি আরেকজনের কাছে হাত পাতবে ? আত্বসন্মান বলে কি কিছু নেই ?
ধুর। বাঙালীর ও জিনিষ না থাকাই ভাল।
0 comments:
Post a Comment