তার যে এমন মাথার ব্যামো কেউ কি সেটা জানতো ? প্রশ্ন করেছিলেন সুকুমার রায়।
কেউ জানত না। কারন মাথার ব্যামো দেখা যায় না। কোন কারনে প্রকাশ ঘটলে লক্ষন দেখে সেটা সম্পর্কে ধারনা করা যায়। যেমন দেখাল সামনে দাড়ানো ওই লোকটা।
বেশ নাদুস নুদুস চেহারা, শান্তশিষ্ট মুখ, গোবেচারা ভঙ্গিতে দাড়িয়েছিল। দেখে মনে হতে পারে কয়েক ঘন্টা দাড়িয়ে থাকলেও তার কোন পরিবর্তন হবে না। কিন্তু পরিবর্তন ঘটল। সামনে একটা বাস দেখা গেল। এগিয়ে আসছে। আর তখনই তার মাথার ব্যামো চাগিয়ে উঠল। পড়িমড়ি করে একটা দৌড় দিল, একজনকে ধাক্কা দিয়ে ঘুরিয়ে দিল, তারপরের জন্যকে উল্টে ফেলল। কোনদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রক্ষেপ না করে বাস থামার আগেই হাতল চেপে ঝুলে পড়ল।
এই মাথার ব্যামোর জন্য তাকে হাসপাতালে নিতে পারেন না। সত্যি বলতে কি তাহলে হাসপাতাল বানানোর দায়িত্ব দিতে হয় হাউজিং কোম্পানীকে। কিংবা অন্যভাবে বললে বলতে পারেন তারা আসলে বাড়ি না বানিয়ে হাসপাতালই বানাচ্ছে। সেখানে বাস করছে নানান ধরনের মাথার ব্যামোঅলা লোকজন।
ভদ্রলোক বেশ ভালভাবেই হেটে যাচ্ছিলেন। পিছনদিক থেকে একটা গাড়ি এগিয়ে এলো। সেকেন্ড তিনেক অপেক্ষা করলে ভদ্রলোক চলে যেতে পারতেন, কিন্তু গাড়িটা এগিয়ে গেল তার সামনে। তার পথ বন্ধ করে থামল। ভদ্রলোককে থেকে আর কোন উপায় নেই দেখে পিছনদিক দিয়ে ঘুরে গাড়ির সামনে এগোতে হল।
মাথার ব্যামো?
এই ভদ্রলোক দিব্বি তড়তড় করে নেমে যাচ্ছিলেন সিড়ি দিয়ে। হঠাত করেই পকেটে মিউজিক বেজে উঠল। তিনি ব্রেক করে দাড়ালেন। কারো সাধ্য নেই পাশ কাটিয়ে সিড়ি দিয়ে ওঠানামা করে। তিনি নির্বিকার। অন্যরা দাড়িয়ে আছে, থাকুক না! ধাক্কা তো দেয়নি এখনো।
এটাও কি মাথার ব্যামো ?
বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রাষ্ফিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন (বানিজ্যমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী নন) দাম সামান্যই বেড়েছে, যতটুকু বেড়েছে তাকে মানুষ খুশিমনে গ্রহন করেছে।
বাংলালায়ন এবং গ্রামিনফোন দুজনকেই নিয়মিত টাকা দেয়ার পর ইন্টারনেটে ঢোকা যায় না, প্রধানমন্ত্রী তার পরিবার এবং সঙ্গিসাথীদের নিয়ে বিদেশ গেছেন আইটির প্রসার ঘটিয়ে মেডেল আনতে।
গাড়িভাড়া বাড়ায় গাড়ির আশা বাদ দিয়ে পায়ে হাটা শুরু করেছেন তিনি। খাবারের দাম বাড়ায় খাবার পরিমান কমিয়ে দিয়েছেন। আষ্ফালন কমেনি, সেটা বেড়েছে। ইলেকশন আসুক, দেইখ্যা লমু।
এসব কি মাথার ব্যামো ?
দিনের আলো তখনো পুরো যায়নি। পথে চলতে একজন হঠাত পথ আগলে দাড়াল। ঢাকা শহরে এমন ঘটনায় চমকে উঠা স্বাভাবিক। কে কখন কোনদিক থেকে ঠেক দেয় তার কি ঠিক আছে। ভাল করে দৃষ্টি দিতে হল পথ আগলানো ব্যক্তির দিকে।
বয়স বিশের কাছাকাছি। পড়লে নোংড়া, ছেড়া পোষাক। গায়ে ময়লার কালো স্তর। মাথার চুলগুলো ডক্টর হু এর মত। পিঠের বিশাল ঝোলা বলে দিচ্ছে পেশা। রাজপথ থেকে কিংবা ডাষ্টবিন থেকে যাকিছু প্রয়োজনীয় মনে হয় কুড়িয়ে ঝোলায় ঢুকানো।
তার বক্তব্য বুঝতে সমস্যা হলেও একসময় মর্ম জানা গেল। হাতে একটা পাচটাকার নোট বাড়িয়ে ধরে বলছে, এক প্যাকেট চানাচুর কিনমু। এই পাচটাকা নিয়া দশ টাকার নোট দ্যান। পাচ টাকায় দ্যায় না, আট টাকায় দ্যায়।
বেশ আবদার। মাত্র পাচটাকা। একটা সিগারেটের দাম এরচেয়ে বেশি। যে গল্প তৈরী করেছে তারদামই দশটাকার বেশি। একটা দশটাকার নোট হাতে দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তাতেও বাধা।
আবারও কষ্ট করে বুঝতে হল তার বক্তব্য। তার হাতের পাচ টাকা নিতে হবে। আটটাকায় যখন দ্যায় তখন দশ টাকা যথেষ্ট, তাই বলে পনের টাকা দরকার নেই।
বিশাল মাথার ব্যামো আছে। হাতে টাকা পেয়ে কেউ হাতছাড়া করে!
0 comments:
Post a Comment