ঈদের আগে পরিচিত একজন একব্যাগ জামাকাপড় কিনে হাজির। নানারকম রঙে নক্সা করা, নানান ডিজাইন। একেই বোধহয় বলে বিমুর্ত চিত্রকলা। আলপিন, কাক, রঙের ছোপ, কবিতার পাতা, রবীন্দ্রনাথ, লালন, লাল-সবুজ সবকিছুই। জিজ্ঞেস করলাম কোথায় কেনা। উত্তর পেলাম, আজিজ সুপার মার্কেট।
মনে করার চেষ্টা করলাম সেখানে যাওয়া হয়না কতদিন। সেখানে কাপড়ের দোকান দেখেছি বলে মনে পড়ে না। একসময় নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলেই কথাটা মনে এল। সেটা অন্তত একটা যায়গা যেখানে বইয়ের দোকানে গেলে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে না, কি বই লাগব ? নাম কন ?
না, সেখানে বইয়ের নাম মুখস্ত না করেই যাওয়া যায়। নেড়েচেড়ে দেখা যায়। পাঠ্যবই আর জনপ্রিয় উপন্যাসের বাইরেও নানাবিষয়ের বই পাওয়া যায়। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, চলচ্চিত্র নিয়ে সমালোচনা, রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষন সবই। আর নানারকম পত্রিকা। অন্য কোথাও সেগুলো চোখে পড়ে না।
তার জামাকাপড় কেনার বহর দেখে মনে হয়েছিল ব্যবসা ভালই চলছে। কাগজে দেখেছিলাম দেশের কিছু প্রথিতযশা শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী এই ব্যবসায় নেমেছেন। অন্যকিছুতে যখন পেট চলছে না তখন এটা করতে দোষ কোথায় ? অন্যরা তো করেই, তারা করলে চোখ টাটাবেন কেন ? ভাবলাম যাহোক, একটা গতি হচ্ছে। হবে। তারা এতদিনে বুঝেছেন কোনপথে এগোতে হয়।
খবরটা পেলাম অনেক পরে। আজিজ সুপার মার্কেট থেকে বইয়ের দোকান উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেখানে হবে পোষাকের দোকান। নিশ্চয়ই সাথে খাবারের দোকান। এরচেয়ে চালু ব্যবসা এখন আর নেই। আরে, আপনার পরিচয়ই তো পোষাকে। আর শরীরে। কোন পোষাকে আপনার শরীর কেমন দেখাবে সেটাই যদি ঠিক না করলেন তাহলে সমাজে থাকা কেন। বনে থাকলেই পারেন। আপনি কি বারাক ওবামা যে পোষাক চেহারায় চাকচিক্য না থাকলেও চলবে ? যেখানে যাবেন পাত পাবেন ?
ওসব থাকতে হয়। বার্গার-পিজ্জা খেয়ে শরীর চকচকে করবেন, তারপর কিছুটা ঢাকবেন বাকিটা দেখাবেন। কোথায় কতটুকু রাখতে হবে, কতটুকু ঢাকতে হবে সে নিয়ে ভাবার কিছু নেই। সেটা জানিয়ে দেবে আপনার সঙ্গী বা সঙ্গিনী অথবা যারা দোকান দিয়ে বসেছেন। তাতেও কাজ না হলে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রণিক মিডিয়া তো আছেই। কোন ঋতুতে কোন পোষাকে সাজবেন জানানোর মহান দায়িত্ব নিয়েছেন তারা। কাগজ খুলে কিংবা টিভি খুলে দেখে নেবেন। আপনার পকেট ভারী থাকাই যথেষ্ট। সেটা হাল্কা করার মানুষের অভাব নেই। আগেই বলেছি পথ কারা দেখিয়েছেন। এসবের কাটতি বেশি, লাভ বেশি। এসবের কাষ্টমার বইয়ের কাষ্টমারের মত মাদ্দামারা না। ৫০ টাকা ১০০ টাকা নিয়ে হাউকাউ করে না। যত বেশি হাকবেন তত চাহিদা বাড়বে। দেখে আরেকজন বলবে, রেয়ার মাল তো। কই পাইলি ?
খবরের সাথে সাথে আরো কিছু বিষয় চোখে পড়ল। কেউ কেউ মনে কষ্ট পেয়েছেন তাদের আড্ডা উঠে যাচ্ছে খবর পেয়ে। ওখানে চা খেয়ে সিগারেট ফুকতে ফুকতে যে রাজা-উজির মারার ব্যবস্থা ছিল তা বুঝি হাতছাড়া হয়ে যায়। আবারো এমন যায়গা কবে মিলবে কে জানে ? কে মিলাবে ? ওপারবাংলার মুখ্যমন্ত্রী নাহয় কবিতা পড়েন, কবিতা লেখেন। এপারের মুখ্যমন্ত্রী তো সেটা করেন না। তার কথা যারা লেখে তারা বাড়িতে কপি পৌছে দেয় সেলফে সাজিয়ে রাখার জন্য। তারা লিখেই খুশি।
সত্যিই দুঃখ পাবার মত ঘটনা। আমি ওদিকে যাওয়া ছেড়েছি বহু আগে। এবারে অন্যদের ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বের করা হচ্ছে। এদের পাশে দাড়ানোর কি কেউ নেই ? কোন জনদরদী যিনি হাতে ধরে টেনে দাড় করাবেন। ধরে রাখবেন যেন পড়ে না যায়।
0 comments:
Post a Comment