‘মুখের কথাগুলো যদি পানি হত তাহলে দেশ বন্যায় তলিয়ে যেত।’ বহুবছর আগে কথাগুলো বলেছিলেন চসার।
তার সময়ে বৃটেনে জনসংখ্যা কত ছিল, তাদের সেই কথার তোড়ে বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুন বড় একটি দেশ কিভাবে তলিয়ে যেত সে নিয়ে তর্ক করতে পারেন। তবে বাংলাদেশে আমরা জলস্রোত আর জনস্রোত দুইই দেখে অভ্যস্থ। আর কথার স্রোত। যদি কোনভাবে কথাগুলো পানিতে পরিনত হত- বাপরে!
কথা বলতে সবাই পছন্দ করেন। শিক্ষিত-অশিক্ষত, জ্ঞানী-মুর্খ, যাত্রী-ড্রাইভার, ছাত্র-শিক্ষক, চোর-পুলিশ সবাই। রাজনীতিবিদদের কথা উল্লেখ করলাম না কারো ব্যবসায় খোচা দেয়া অন্যায় বলে।
সালে বিশ্বের নামিদামী লোকেরা একসাথে বসে ঠিক করলেন মিলেনিয়াম গোল। গোল দিতে পারলে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশে দারিদ্র অর্ধেক কমে যাবে। দেশের বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ এবং সমাজসেবী সাথেসাথে বললেন, ২০৩০ সালে দারিদ্র থাকবে না। বিবিসি বেকুবের মত প্রশ্ন করেছিল, একথা বলছেন কিভাবে ?
তিনি বললেন, কেন ? ১৫ বছরে অর্ধেক হলে ৩০ বছরে পুরো হয়। অংক শেখেন নি ?
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করলেন ইউ আহমেদ। তিনি তখন নবীত্ব লাভ করেছেন। ব্যাংকারদের ডেকে ধমকান, শিক্ষকদের ডেকে উপদেশ দেন, সাংবাদিকদেন নিয়ম শেখান। পশ্চিমা এক অর্থনীতিবিদ বললেন ২০২৫ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে। দুদিন পর তিনি অর্থনীতির ভবিষ্যতবানী করলেন, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।
তবে তাকে আর কতটুকুই বা দোষ দেয়া যায়। তিনি সবে সাহিত্যিক হিসেবে শান্তিনিকেতন ঘুরে এসেছেন। ভারত সরকার খুশি হয়ে ঘোড়া উপহার দিয়েছে। চালের দাম ৩০০ ডলার থেকে হাজার ডলারে গেছে। তা যাক, কথা বলতে সমস্যা কোথায়। কেউ থামাচ্ছে না। আগাম ঘোষনা দেয়া আছে তাদের সরকারকে বৈধতা দেয়া হবে।
সারা বিশ্ব আগাম মন্দার আশংকায় যখন কাপছে, সকাল-বিকেল নেতার বৈঠক করছেন, এই এল বলে। একসময় এসেও গেল। তারা হাজার কোটি, লক্ষ কোটি টাকা ঢাললেন। আমাদের অর্থনীতি-সমাজনীতি-রাজনীতিবিদরা বললেন ওসবের ছোয়া এদেশে লাগবে না। আমরা ওদের থেকে আলাদা। দেখেন না ওরা কতরকম কুকর্ম করে, আমরা করি না। আমরা সবাই ধর্ম পরায়ন, সবাই কর্মঠ, সবাই দেশপ্রেমি, সবাই সচেতন।
তবে এসে গেল। অর্থনীতিবিদরা বললেন এটা ওদের দোষ। ওদের ভুলের কারনে আমাদের এই অবস্থা। ওদেরকে ক্ষতিপুরন দিকে হবে। না দিলে হয়ত মিছিল, অবস্থান ধর্মঘট, হরতাল। সরকার হিসেবে বসে গেল। ওরা টাকা দিয়েছে, এখানেও দিতে হবে। দেশ টিকিয়ে রাখতে হবে। সরকারীদল-বিরোধীদলে এখানে ভেদাভেদ থাকলে চলবে না। সবাই শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার। দেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হবে, ভাতে মরবে। তাদেরকে মরতে দেয়া হবে না। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভরনপোষনের দায়িত্ব যারা নিয়েছেন তাদের রক্ষা করতেই হবে। এখনি যাদের দেয়া হয়নি তারা হতাস হবেন না। আপনারাও পাবেন। টাকার ব্যবস্থা হচ্ছে। আপনারা ব্যাংকের সুদ কমান। তবে সুদ বলবেন না। সেটা খারাপ কথা। ব্যাংক বলল তাহলে আমরা যে টাকা দেই সেটাও কমাতে হয়। নইলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখবে কেন ? ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে অকারনে খরচ করবে, নয়ত অলাভজনক খাতে বিনিয়োগ করবে। শেয়ার কিনবে। এটা করতে দেয়া ঠিক না। আমরা তো লাভ করছিই, আমাদের দিকে দৃষ্টি কেন ? দেখুন না, হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঋনখেলাপি হওয়ার পরও আমাদের লাভ কমেনি। ঋনখেলাপি নিয়ে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। যারা নিজেরা ওকাজ করতে পারেনি তারাই হাউকাউ করে। এদিকে দৃষ্টি দেবেন না। ইউরোপ-আমেরিকা ব্যাংকে টাকা দিচ্ছে, পারলে আপনারাও দিন। ভাত দেবার মুরোদ নেই কিল মারা গোষাই।
শতশত শ্রমিক লাশ হয়ে ফিরছেন। হাজার হাজার ফিরছেন সর্বস্ব হারিয়ে। এতে হতাস হবেন না। আমাদের বাইরে লোক পাঠানোর গতি ঠিক আছে। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন যাচ্ছে। এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখুন সেখানে কত ভীড়। হাটাচলা করা দায়। সব দেশের সরকারের সাথে কথা হয়েছে, কোথাও কোন বাংলাদেশী শ্রমিকের চাকরী যাবে না।
তবে কথাকে যদি সত্যিকারের কথা বলতে হয় তা আমরা শুনেছি গত কয়েক মাসে। নদীর ওপর সেতু হবে, নিচে টানেল হবে, ১০ টাকায় চাল খাওয়ানো হবে, বিনামুল্যে সার দেয়া হবে, পারমানবিক চুল্লি দিয়ে বিদ্যুত সমস্যার সমাধান করা হবে, মহাশুন্যে স্যাটেলাইট পাঠানো হবে, শিক্ষা অবৈতনিক করা হবে, বাধ্যতামুলক করা হবে, সামাজিক হাসপাতাল গড়া হবে, বঙ্গোপসাগর থেকে পানি এনে ঢাকাবাসিকে খাওয়ানো হবে ...
কথা কিভাবে পানি হতে পারে আমার ধারনা নেই। তবে আমার অনুরোধ, যদি সে সম্ভাবনা থাকেই তবে অন্তত খরার সময় সেটা প্রয়োগ করুন। এটুকু সংযম অন্তত দেখান। অনেকেই ভাতে মরছেন। তাদেরকে পানিতে মারবেন না।
0 comments:
Post a Comment