বাংলাদেশে পাইরেসি হয়। সফটওয়্যার, গেম, ভিডিও, অডিও। এবং বই। সমরেশ মজুমদার প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে মুল বই এবং পাইরেটেড কপি দেখিয়েছিলেন। প্রতিকার চেয়েছিলেন। উত্তরে নাকি প্রধানমন্ত্রী পাইরেটেড কপি নেড়েচেড়ে দেখে তাদের দক্ষতার প্রশংসা করেছিলেন। প্রতিকার যে হয়নি সেকথা বলার বোধহয় প্রয়োজন নেই। ফল যা হয়েছে তা আতংকিত করার মত। পশ্চিমবঙ্গের লেখক-প্রকাশকরা তক্কে তক্কে থাকেন যেন তাদের বইয়ের কোন কপি কোনভাবেই বাংলাদেশে না ঢোকে। ঢুকলেই তা হাজার হাজার কপিতে পরিণত হবে। মুল বই কেউ কিনবে না।
তা-তো বটেই। পাইরেটেড কপি যেন কেউ কিনতে না পারে সেজন্য মুল কপিই তারা সরিয়ে রেখেছেন। চোরের ভয়ে থালাবাসন সিন্দুকে, খাবার মাটিতে। নয়ত খাবার বন্ধ। কিন্তু সমরেশবাবু তো বারবার স্বীকার করেছেন পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বাংলাদেশে পাঠকের সংখ্যা বেশি। বিক্রিও বেশি হয় (হতো)। বই আসতে বাধা দেয়ায় যারা বঞ্চিত হচ্ছে সেই বিপুল সংখ্যক পাঠকের কথা কি তিনি ভেবেছেন ? নাকি রপ্তানি বন্ধ করে অন্য কোন উপায়ে বিক্রি বেড়েছে ? তিনি উল্লেখ করেছেন তার বই হয়ত লক্ষ কপি বিক্রি হয় পাইরেটেড হয়ে। আমার ধারনা তিনি লক্ষ কপি বলতে এক লক্ষ বুঝিয়েছেন, এবং তিনি সম্ভবত বাংলাদেশে এসে সাধারন মানুষের সাথে মেশার সুযোগ পাননি। আমার অভিজ্ঞতা এবিষয়ে বেশি সেকারনেই বলছি, আমার ধারনা এই সংখ্যা অনেক লক্ষ। অবশ্যই পাইরেটেড কপি, কারন মুল বই কখনো এই পরিমান বিক্রি হয়না, অতীতে হয়নি।
তাহলে বিষয়টি কি দাড়াচ্ছে।
বই পাইরেসি হলেই তার বিক্রি বেড়ে যাচ্ছে, সাদামাটা ভাষায় বিষয় সেটাই। কারণটাও বুঝতে সমস্যা হবার কথা না। লেখক জানেন, প্রকাশক জানেন, ব্যবসায়ীরাও জানেন। কেউ মুখ খুলতে রাজি নন।
যারা জানেন না তাদের কিছুটা ধারনা দিচ্ছি। সমরেশ মজুমদারের ত্রিরত্ন (উত্তরাধিকার + কালবেলা + কালপুরুষ) প্রায় হাজার পৃষ্ঠার বই। পাইরেটেড কপি পাওয়া যায় ২০০ টাকায় কিংবা আরো কমে। আপনি কি পাঠককে বলবেন এই বই ৭০০/৮০০ টাকায় কিনতে ? আর তিনি কিনবেন ? তিনি তো প্রশ্ন করতেই পারেন তিন দশকের বেশি পুরনো বই রিপ্রিন্ট করে তাদের পকেটের টাকা এভাবে নেয়া হচ্ছে কেন। আমার ধারণা এই দামে বিক্রির চেষ্টা করলে বিক্রি অন্তত দশ ভাগের একভাগে নেমে আসত। বিপরীতভাবে দেখলে, দাম এই পর্যায়ে আনায় বইয়ের বিক্রি দশগুন বেড়েছে। তারমানে দশগুন বেশি পাঠক বই পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
বেশিদামে পাঠক বই কিনবেন না সেটা সকলেই খুব ভাল করে জানেন। আর দাম কমানো কথা উঠলেই বলবেন তাদের কতরকম খরচ। লেখকের সন্মানী, কাগজের দাম, ছাই-বাধাই। তারপর নিজের লাভ।
আমি বলি, এখানে নিজের (প্রকাশকের এবং বিক্রেতার) লাভটা সকলের আগে। লেখকের সন্মানী ততটুকুই দেয়া হয় যতটুকু না দিলে লেখা পাওয়া যায় না। আর বাকিটা চাপাবাজি। যারা পাইরেটেড বই ছাপেন তারাও কাগজ, প্রেস, লাভ এই হিসেব মেনেই ব্যবসা করেন। এরসাথে লেখকের সন্মানী (যদি সন্মানী বলা যায়) যোগ করলে কি দাম তিনগুন-চারগুন হওয়ার কথা! তাহলে লেখকদের তো কোটিপতি হওয়ার কথা ছিল।
জানি ছাপার মানের কথা তুলবেন। যারা পাইরেডেট বই ছাপেন তারা যেমন তেমন কাগজে ছাপেন। খরচ কমান। কারন এটাই তাদের ব্যবসার মুলমন্ত্র। কিন্তু আপনাদের তাতে অনিহা কেন ? সারা পৃথিবীতে মানুষ পেপারব্যাক গল্প-উপন্যাস পড়ে। তারা পড়ার জন্যই সেসব কেনে। আপনারা কেন আশা করেন পাঠক বই কিনে ড্রইংরুমে শোকেসে সাজিয়ে রাখবেন। এক বই একবার পড়াই যথেষ্ট তা ৮০ গ্রাম অফসেটেই হোক আর খবরের কাগজেই হোক। আপনার সেপথে যাচ্ছেন না কেন ? লেখক-প্রকাশক সুযোগ পেলেই চিত্তবাবু কত কাজের মানুষ ছিলেন, কি অবদান রেখে গেছেন সেকথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলবেন। তিনি আসলে কি করেছিলেন সেটা একবারও খোজ করেছেন ? যদি ভুলে গিয়ে থাকেন তাহলে মনে করিয়ে দেই, তিনি একই বই সুলভ এবং সোভন নামে দুধরনের সংস্করন বের করতেন। সোজা কথায় একটার দাম কম, নিউজপ্রিন্ট পেপারে, আরেকটি সাদা কাগজে, বোর্ড বাধাই। যার যেটা পছন্দ সে সেটা কিনবে। বই কেনাকে আন্দোলনের পর্যায়ে নিতে পেরেছিলেন তিনি। আপনারা তার প্রশংসা করে কোন মুন্ডুটা করছেন ?
একসময় আমি পুরোপুরি পাইরেসির বিপক্ষে ছিলাম। আমি যেখানে নিয়মিত বই কিনি, যিনি মুলত পাইরেটেড বই বিক্রি করেন তাকে একদিন বলেছিলাম, একদিন তো এসব বন্ধ হবে। তখন কি করবেন ? তিনি করুণভাবে তাকিয়ে বললেন, আমরা যে হাজার হাজার পাঠক তৈরী করলাম সেটা কি মিথ্যে ?
আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হল। তার সেলফের দিকে দেখলাম ভাল করে। সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ থেকে শুরু করে একেবারে সাম্প্রতিক আদিগা, ওবামার বই পর্যন্ত থরে থরে সাজানো। গল্প-উপন্যাস-কবিতা-প্রবন্ধ-ইতিহাস-দর্শন এমন বিষয় নেই যার বই পাওয়া যায় না। মানুষ ভীড় করে দেখছে, কিনছে। এটা কি আসলেই সম্ভব হত যদি এত সস্তায় বই কেনা না যেত ?
আপনারা বই পড়ার সামাজিক আন্দোলনের কথা বলেন। আন্দোলন কিভাবে হয় সেটা কি কখনো খোজ নিয়েছেন ? আপনি কি জানেন রাজনৈতিক মিছিলে-সমাবেশে লোক আনার জন্য কি পরিমান কাঠখড় পোড়াতে হয় ? আপনাদের আন্দোলনে সঙ্গি হবে কে যাচাই করেছেন ?
বই কেনা নিয়ে মুজতবা আলী যে যুগান্তকারী কথা বলে গেছেন তারপর আর নতুন করে বলার থাকে না। একজন পাঠক হিসেবে সরলভাবে আমার বক্তব্য জানাই।
1. আমি বই পড়তে চাই। ঢাকার হোক আর কোলকাতার হোক। বইকে আলু-পটলের ব্যবসার পর্যায়ে নেবেন না। কিভাবে পাঠকের হাতে বই পৌছানো যায় সেটা ভেবে দেখুন।
2. সমরেশ মজুমদারকে বলছি, একসময় হুমায়ুন আহমেদের বইও কপি করে বিক্রি হত, এখন হয় না। এজন্য তার কিংবা তার প্রকাশকের প্রধানমন্ত্রীর সহযোগীতা প্রয়োজন হয়নি। আপনারা পারছেন না কেন ? আপনার দেশের লোকেরা এদেশে অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যবসা দখল করেছে। আপনারা পিছিয়ে রয়েছেন কেন ?
3. বাংলাদেশের পাঠক কলকাতার সাহিত্য পছন্দ করে একথা যদি সত্যিই স্বীকার করেন, কলকাতার চেয়ে ঢাকায় বিক্রি বেশি হয় একথা যদি মানেন (না মেনে উপায় নেই) এবং তাদেরকে পাঠক হিসেবে পেতে চান তাহলে সরাসরি ঢাকা থেকে বই ছাপার ব্যবস্থা করুন। হুমায়ুন আহমেদ যদি ৫০ লক্ষ টাকা এডভান্স নিতে পারেন সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশ আরো বেশি পাবেন। পাইরেসি বন্ধের দায়িত্ব ছেড়ে দিন প্রকাশকের ওপর। শংকরবাবু বিবিসিকে বললেন বাংলাদেশের প্রকাশক তারকাছে বইয়ের জন্য যায় না। আমি সবিনয়ে বলছি, আপনার হয়ত জানা নেই পাঠক আপনাকে শংকর নামে চেনে, প্রকাশককে চেনে না। মস্তিস্কহীন প্রকাশকের মাথায় যদি নিজে থেকে বিষয়টা না ঢোকে তাহলে ঢুকানোর ব্যবস্থা করুন না কেন ?
4. বইয়ের দাম কমান। লেখক হিসেবে প্রকাশকের ওপর যতটুকু প্রভাব খাটানো সম্ভব খাটান। নয়ত তারাই আপনাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে। পাঠকের সামর্থ্য বিবেচনায় আনুন। যে বই দুঘন্টায় পড়ে ফেলা যায় তার জন্য ২০০ টাকা ব্যয় করার সামথ্য বাঙালীর নেই। কোটিপতিরা আর যাই হন পাঠক নন। তাদের বিনোদনের বিষয়ের অভাব নেই। যারা বই পড়তে চায় তাদের বক্তব্য শুনুন। পাইরেটেড বই বেশি বিক্রি হয় তার কারন এই না যে সেটা পাইরেটেড। একমাত্র কারন সেটার দাম কম। এটা প্রমান করে পাঠক পড়তে যেমন চায় তেমনি কমদামে বই আশা করে।
5. সারা পৃথিবীতে ইলেকট্রনিক ফরম্যাটে বই বিক্রি হচ্ছে। মানুষ কম্পিউটারে, আইফোনে, ই-বুক রিডারে বই পড়ছে। ৫ ডলারের বই ৫ সেন্টে পড়ে নেয়া যায়। বাংলা বই এই ফরম্যাটে যেতে সমস্যা কোথায় ? একসময় তো সেদিকে যেতেই হবে। আগে থেকেই পরিকল্পনা করছেন না কেন ?
6. নামকরা লেখকের বই অনুলিপি ছাড়াও বহুভাবে চৌর্য্যবৃত্তি হয়। চৌর্য্যবৃত্তি সবসময় ছিল সবসময় থাকবে। এদের হাতে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে নিজের কলম বন্ধ করায় সমাধান কোথায় ?
7. বিশ্বের সবচেয়ে বড় বই বিক্রেতা আমাজন থেকে কিছু শিখুন।
8. পাইরেসির শিকার আরো অনেক মাধ্যম। তারা বিকল্প খুজে নিয়েছে, নেয়ার চেষ্টা করছে। লেখক-প্রকাশক যদি হাত গুটিয়ে থাকে সভ্যতার ভবিষ্যত কি ?
9. বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক আছে, থাকবে। অন্তত বইকে এই বিতর্কের বাইরে রাখুন।
0 comments:
Post a Comment