শয়তানের কারখানা

Mar 6, 2012
শয়তানের কারখানা কথার দুরকম অর্থ হয়। একটা হচ্ছে কারখানার মালিক জনাব শয়তান। আরেকটা হচ্ছে কারখানার কারবার শয়তান নিয়ে। হয়ত শয়তান তৈরী করা হয়। কিংবা মেরামত করা হয়।
শয়তান শব্দটা আপত্তিকর। যদিও শয়তান আছে সৃষ্টির শুরু থেকে। শয়তানের কারনেই নাকি এই বিশ্ব সৃষ্টি। তার দাপট কখনও কমেনি বরং অনেকে বলেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এতখানি যার দাপট তারসাথে সাধারন ব্যক্তির তুলনা করলে সে নিশ্চয়ই নিজেকে হেয় মনে করে। সম্ভব হলে হয়ত আদালতে মানহানির মামলাও ঠুকে দিত। ভাগ্যিস সেটা ঘটেনা। কিংবা সেকারনেই কাউকে সরাসরি শয়তান বলা হয়না, একমাত্র রেগে গিয়ে গালাগালি না করা পর্যন্ত।
বরং পরোক্ষভাবে বলা যুক্তযুক্ত। এতে কারো গায়ে লাগে না, এদিক-ওদিক দিয়ে পিছলে যায়। যেমন ধরুন, অলস মস্তিস্ক শয়তানের কারখানা।
শয়তান বলা হল কিন্তু কারো গায়ে লাগল না। অলস কাকে বলবেন ? চায়ের দোকানে দল ধরে আড্ডা দিচ্ছে তাদেরকে ? শয়তানি কাকে বলবেন ? সামনে দিয়ে যারা যাচ্ছে তাদের কে কি পোষাক পড়েছে, কে কিভাবে হাটছে, কার চেহারা কেমন, শরীরের আকার কেমন এসব নিয়ে মন্তব্য করাকে ?
মোটেই না। অলস হলে দোকান পর্যন্ত গেছেন কিভাবে ? ওই ব্যাটা একটা কাউট্টা, কষ্ট করে একথা বলাও একটা কাজ। তাদেরকে কোনভাবেই শয়তানের ধারেকাছে কল্পনা করা উচিত না। বাঙালীর ইতিহাস দেখুন। বর্তমানের, নিকট অতিতের, দুর অতিতের, সুদরি অতিতের। সব যায়গায় লেখা আছে বাঙালী কর্মঠ, পরিশ্রমি। তাদের মস্তিস্কে শয়তার বাসা বাধতেই পারে না। নড়াচড়ার চোটে এক ঝটকায় ছিটকে যাবে।
শয়তান বরং বলা যায় অন্যদের। ওই ধরুন আমেরিকানদের।
অবশ্য তাদের যুক্তি আলাদা। এমনকি যেসব বাঙালী সেদেশে বাস করেন তারাও সকালে ঘড়ি দেখে একেবারে মিনিটের হিসেবে বিছানা ছাড়েন, কাজে দৌড় দেন। পথে কত মিনিট সময় লাগবে সেটাও হিসেব করা। বাড়িতে কখন ফিরবেন সেটাও হিসেব করা। চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়া তো দুরের কথা, ফোনে কয়েক সেকেন্ড কথা বলার সময়ও নেই। যারা ট্যাক্স চালার তারা নাকি সকালের খাবার খান দুপুরে। তখন ব্যস্ততা কিছুটা কমে। তার আগে পুরো সময় দৌড়াদৌড়ি। কেউ হাত তুললেই থামতে হয়, যেখানে যেতে চায় সেখানে নিতে হয়। যামু না বলা কিংবা দরদাম করা তো দুরের কথা, ওই যায়গা চিনি না বললেও লাইসেন্স বাতিল।
আর আশ্চর্যজনকভাবে তাদের কোন আক্ষেপও নেই। তারা ধরেই নিয়েছে এটা নিয়ম। সবাইকে কাজ করতে হবে, কাজ করলে আয় হবে, সেই আয়ে চলতে হবে। সপ্তাহের ছুটিকে মনে হয় স্বর্গসুখ। একে পাপের ফল ছাড়া আর কি বলা যায়! সবসময় নরকবাস।
বাঙালীর দিকে একবার দেখুন তো। কেউ কেউ বলে দেশে ৩ কোটির বেশি বেকার। তাই বলে কি তাদের রসকশ থাকবে না। ওই চায়ের দোকানের কথাই ধরুন। পথের দুধারে শতশত চায়ের দোকান, হাজার হাজার মানুষ। জীবন উপভোগ করছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি সবকিছু চর্চা করছে। এমনকি শরীরর্চ্চা পর্যন্ত। দুজন ঠেলাঠেলি করতে গিয়ে একজন ধাক্কা খেল রিক্সার সাথে। রিক্সায় উঠিয়ে হাসপাতালে নিতে হল। আরেকজন বীরদর্পে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল অন্যদের দিকে, কি খেলডা দেহাইলাম!
কেউ কেউ বলেন গরীব বাঙালী খুব কষ্টে আছে। কে জানে ? যারা গ্রামে থাকে, চাষবাস করে তারা নিশ্চয়ই কষ্টে আছে। ফুটপাত নেই, চায়ের দোকান নেই, চা-সেগারেট কেনার টাকা নেই, আড্ডা নেই। তাদের কষ্ট থাকতেই পারে। তারা নিতান্ত মুর্খ বলেই তো। যারা বুদ্ধিমান তাদের তো কষ্ট নেই। রিক্সা থামিয়ে তার ওপর পায়ে পা তুলে সিগারেট টানছে। একজন জিজ্ঞেস করল, এই খালি যাইব ? সে ঘুরেও তাকাল না। পাশের জনকে জিজ্ঞেস করায় সে ধমকে উঠল, দ্যাখতাছেন না রেষ্ট লইতাছি। হাইট্যা যান।
যারা কষ্টের কথা বলেন তারা আসলে কি বুঝান বোঝা কঠিন। বিশেষজ্ঞের কথা বোঝার জন্যও বিশেষজ্ঞ হতে হয় কি-না। তারা হয়ত বলেন এত পরিশ্রম সহ্য হয় না, এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত যেন জীবন উপভোগের আরো সময় পাওয়া যায়।
যারা শয়তানের কারখানা শব্দটি উচ্চারন করেন তারা বলে উঠতে পারেন, বাপরে, এত পরিশ্রম করে কষ্টে থেকেই এই অবস্থা! বিনাকষ্টে থাকলে সেই দৃশ্যটা না জানি কেমন হবে ?

0 comments:

 

Browse