সভ্যতা বনাম অসভ্যতা

Oct 30, 2012

অনেকবছর আগে একজন কার্টুনিষ্ট একটি কার্টুন একেছিলেন। একদিকে আধুনিক সভ্য মানুষ, পাশে অত্যাধুনিক অস্ত্র। আরেকদিকে আদিম মানুষ, সাথে আদিম অস্ত্র। আধুনিক মানুষের দিকে আঙুল তুলে বলছে, দেখ, ওরা বলে আমরা অসভ্য।
অস্ত্র তৈরী করা নিশ্চয়ই সভ্যতার পরিচয়। আমেরিকার আইন অনুযায়ী যেকোন নাগরিক দোকানে গিয়ে অস্ত্র কিনতে পারেন। তার প্রয়োজন অনুযায়ী পিস্তল, রাইফেল থেকে শুরু করে মেসিনগান পর্যন্ত। তারা সবচেয়ে সভ্য জাতি এতেও কোন সন্দেহ নেই। অসভ্য তারাই যারা আমেরিকানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করে। যদিও অস্ত্রগুলি তৈরী হয় তাদের দেশেই।
অস্ত্রের বিচারে সভ্য-অসভ্য হিসেব করা সম্ভব না। আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট উন্নত করেছিলেন পাহাড় ভাঙার জন্য। এমনকি আইনষ্টাইন এটম বোমা তৈরীতে কাজ করেছেন বিশ্বকে জাপানীদের হাত থেকে রক্ষা করতে, আর বুশ-ব্লেয়ার ইরাকে অভিযান চালিয়েছেন সাদ্দাম হোসেনের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে।
অস্ত্র বাদ দিয়ে বরং সত্যিকারের সভ্যতার পরিচয় যাতে প্রকাশ পায় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। মানুষ যত লেখাপড়া করে তত সভ্য হয়। আচারে, ব্যবহারে, কথাবার্তায় সবকিছুতেই তার প্রকাশ ঘটে। সেদিক থেকে হিসেব করলে সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিরাই সবচেয়ে সভ্য, আর বকলম ব্যক্তিরা অসভ্য।

বাংলাদেশে দুজন মানুষ যদি একসাথে হন তাহলে যে আলোচনা শুরু হয় তা হচ্ছে দুর্নীতি। এই দুর্নীতি লক্ষ বা কোটি টাকার না, শতকোটি - হাজার কোটি টাকার। একজন অশিক্ষিত (অসভ্য) ব্যক্তি, যে গুনতে ভুল করে তারপক্ষে হাজার কোটির হিসেব করা সম্ভব না। বরং এই পরিমান কত বোঝানোর জন্য তাকে বলা যেতে পারে, এই টাকা বস্তায় ভরে তার মাথায় চাপালে সে ভর্তা হয়ে যাবে।
সভ্য-অসভ্যের হিসেব এখানে টিকছে না। বরং সত্যিকারের অর্থ প্রকাশ করলে বলতে হয়, বড় দুর্নীতিবাজ মানে বেশি শিক্ষিত। কিংবা বেশি সভ্য। অন্যকথায় যে যত শিক্ষিত তার দুর্নীতি করার সুযোগ তত বেশি। অসভ্যতাও তত বেশি। সভ্য হতে হলে অবশ্যই সভ্য পোষাক পড়তে হয়, ইংরেজির মত সভ্য ভাষা শিখতে হয়, লেটেষ্ট মডেলের জিনিষপত্রের খোজ রাখতে হয়।
বিষয়টা গোলমেলে এতে সন্দেহ নেই। সবাই বিদ্যালাভ করে বিদ্যাসাগর হন না। তিনি নিজের জীবনকে উদাহরন হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন তার সময়ে। বর্তমানে কি করতেন বলা কঠিন। তার সময়ে সততা, চরিত্র, নিষ্ঠা ইত্যাদি বিবেচনায় তিনি সন্মান পেয়েছেন। সন্মানের বিচার যে সমাজে টাকায় হয় সেই সমাজে তিনি কি সেই নিয়মই মানতেন, নাকি বাস্তববাদি হতেন সে প্রশ্নের উত্তর হয়ত কখনোই পাওয়া যাবে না।
বরং বিদ্যাসাগর আর বর্তমানের মধ্যবর্তী সময়ের কথা কিছুটা বিবেচনা করা যেতে পারে। ডারউইনের ভাষায় বিবর্তনের প্রক্রিয়া বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
এখনও কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন সততা সবচেয়ে বড় সম্পদ। অর্থ বিষয়ক সততা, চিন্তায় সততা, কথায় সততা, কাজে সততা, আচরনে সততা সবকিছুই। সেইসাথে নিজে যখন প্রতিপদে হোচট খাচ্ছেন তখন এই নীতিবোধের সাথে আরো কিছু যোগ করে নিচ্ছেন, তার সন্তানকে হোচট খেতে দেবেন না।
ফলাফল দৃশ্যমান। আগামীতে যে প্রজন্ম নেতৃত্বে আসছে তাদের মধ্যে প্রাচীন নীতিবোধ অনুপস্থিত। তারা জানে সমাজে টিকতে হলে অর্থ প্রয়োজন, ক্ষমতা প্রয়োজন। যে পথে সবচেয়ে সহজে, সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় সেটাই উত্তম পথ। লাজ-লজ্জা বলে কিছু থাকতে নেই।
কার্টুনিষ্ট হয়ত একদিকে সভ্যতা আরেকদিকে অসভ্য রেখে প্রশ্ন করতে পারেন। একজন আমেরিকান কখনো নিজেকে অসভ্য ভাবেন না। ভাবার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে যার হাজার কোটি টাকা আছে, আরো হাজার কোটি মেরে দেয়ার যোগ্যতা আছে তার সমালোচনা করবেন কেন ? আঙুর ফল টক বলে ?

0 comments:

 

Browse