বিশ্বাসঘাতক এবং দেশপ্রেমিক

Apr 21, 2013


লেখক হিসেবে টমাস পেইনকে চেনেন এমন মানুষের সংখ্যা নিশ্চয়ই খুব বেশি না। যদিও আজ থেকে দুশ বছর আগে তার লেখা বই লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে। তখনকার জনসংখ্যা, প্রকাশনা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করলে অনেকের মতে সেই রেকর্ড আজও অক্ষুন্ন। কোন একক ব্রিটিশ লেখক সারা বিশ্বে এতটা আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেননি। এরপরও তার নাম অপরিচিত। কারন জনপ্রিয় হলেও তিনি ছিলেন বিশ্বাসঘাতক। ১৯৬৪ সালে যখন তার ব্রোঞ্জের মুর্তি তৈরী করে বসানোর উদ্দ্যোগ নেয়া হল তখন শহরের মেয়র বললেন অনুমতি দেয়া হবে তবে সেখানে লেখা থাকতে হবে তিনি বিশ্বাসঘাতক। কথার অন্যথা হয়নি। যায়গাটির বর্তমান পরিচয় কনভিক্টেড ট্রেটর এভিনিউ নামে।
একজন ব্যক্তি একইসাথে নন্দিত এবং নিন্দিত হলেন কিভাবে কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। ইংরেজ এই লেখক নিজের দেশে কোন কাজেই সুবিধে করতে পারেননি। কপর্দকশুন্য অবস্থায় আমেরিকা গেছেন। আমেরিকা তখন জর্জ ওয়াশিংটনের নেতুত্বে বৃটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য যুদ্ধ করছে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পেইন সরাসরি জর্জ ওয়াশিংটনের পক্ষ নিলেন। এটাই তার বিশ্বাসঘাতকতার শুরু।

এই উদাহরন তার সম্পর্কে ভুল ধারনা তৈরী করতে পারে। সেকারনে আগেই জানিয়ে রাখা ভাল, স্বাধীনতা লাভের পর ওয়াশিংটন যেভাবে দেশ চালাচ্ছিলেন তাতে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি সরাসরি চিঠি লিখেছিলেন, আপনি কি আদর্শের কথা ভুলে গেছেন, নাকি কখনই আপনার আদর্শ বলে কিছু ছিল না।
তিনি সাধারন মানুষের কাছে প্রিয় হয়েছিলেন সাধারন মানুষের কথা বলে। তার মতে বৃটেনে রাজতন্ত্র রাখার কোন অর্থ নেই। তাদের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয় সেটা সাধারন মানুষের কল্যানে ব্যয় করা উচিত। যাদের বয়স ৬০ এর ওপর তাদের ভরনপোষনের দায়িত্ব সরকারের নেয়া উচিত। যাদের থাকার যায়গা নেই সরকারী খরচে তাদের বাড়ি বানিয়ে দেয়া উচিত, ইত্যাদি ইত্যাদি। তার লেখা রাইটস অব ম্যান বা মানুষের অধিকার বইটি এখনও অনেকের প্রিয়।
ফরাসী বিপ্লবে যখন রাজতন্ত্র উতখাত হল তিনি ফ্রান্সে গিয়েছিলেন। রাজপরিবারের সদস্যদের যখন মৃত্যুদন্ড দেয়া হচ্ছিল তখন তনি ভিন্নমত পোষন করেছেন। তার বক্তব্য, ব্যক্তির পরিবতর্নে কিছূ যায়-আসে না, প্রয়োজন পদ্ধতির পরিবর্তন। তিনি নিজে একবর্ণ ফরাসি ভাষা জানতেন না। ফল হল মারাত্মক। বক্তব্য না বোঝায় তাকে গ্রেপ্তার করা হল।
যেভাবে রক্ষা পেলেন সেটা রীতিমত আরেক গল্প। যাদের গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ করা হবে তাদের দরজায় চিহ্ন দেয়া হল। তার দরজায় যখন চিহ্ন দেয়া হয় তখন দরজাটি ছিল খোলা। দাগ পরল ভেতরের দিকে। পরদিন যখন সৈন্যরা চিহ্ন দেখে কয়েদিদের নিয়ে গেল তখন দরজা বন্ধ। দাগ চোখে পরল না। তিনি রক্ষা পেলেন এবং একসময় মুক্তিও পেলেন।
তিনি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের এতটাই বিরোধী ছিলেন যে একসময় নেপোলিয়নকে চিঠি লিখলেন বৃটেনে আক্রমন করে রাজতন্ত্র উতখাত করার জন্য। কিভাবে সেটা করা যায় সে পরিকল্পনাও জানালেন। নেপোলিয়ন আগ্রহি হয়ে তার সার্বক্ষনিক সহায়তা চাইলেন। তখন তার ভ্রম ভাঙল। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের বদলে ফরাসি রাজতন্ত্র হতে যাচ্ছে না-তো! নেপোলিয়ন নিজেই যখন নিজেকে সম্রাট ঘোষনা করেছেন। তিনি পিছিয়ে গেলেন।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তখন টমাস জেফারসন। তিনি তাকে আমেরিকায় আনার জন্য জাহাজ পাঠালেন। কিন্তু ততদিনে তিনি সকলের কাছেই বিশ্বাসঘাতকে পরিনত হয়েছেন। তিনি বাইবেলের সমালোচনা করেছেন। তার প্রশ্ন, ধর্মের সবকিছু যদি ভালর জন্যই হয় তাহলে সমস্ত সুবিধে ধনী এবং সুবিধাবাদীরা ভোগ করে কিভাবে।
আমেরিকায় তিনি চেষ্টা করেও কোন চাকরী পেলেন না। স্মরন করা যেতে পারে তার বই বিক্রির কোন টাকা তার হাতে পৌছেনি। সহায় সম্বলহীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
টমাস পেইনের জীবন গল্প থেকে কোন অংশে কম আকর্ষনীয় না। সম্ভবত নিজের জীবন দিয়ে তিনি সেই কৌতুককে বাস্তব চেহারা দিয়েছেন,
এক ব্যক্তি নেতাকে জিজ্ঞেস করলেন, বিশ্বাসঘাতক কাকে বলে ?
-যে আমাদের দল থেকে অন্য দলে যায়।
- আর যে অন্য দল থেকে আমাদের দলে আসে ?
- সে দেশপ্রেমিক।

0 comments:

 

Browse