যখন টেলিভিশন প্রথম চালু হয় তখন সেখানে
রং দেখা যেত না। এধরনের টিভির ব্যবহার এখনো আছে। প্রচলিত নাম সাদা-কালো টিভি। অনেক
ফটোগ্রাফকেও বলা হয় সাদাকালো ছবি। কিন্তু বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই জানেন সেখানে
সাদা এবং কালো এই দুটি রং নেই। এই দুইয়ের মাঝখানে যে বহু রং আছে সেগুলি সাদাও না কালোও
না। সেকারনে ইংরেজিতে বলা হয় গ্রেস্কেল। কোথাও হালকা ধুসর, কোথাও গাঢ়। সেগুলিই মুল
সাদা-কালোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আমরা সবকিছু সাদাকালোতেই দেখতে পছন্দ
করি। হয় সাদা নয় কালো। হয় এই পক্ষে নয় ওই পক্ষে। মাঝামাঝি কিছু চাই না। সাদা এবং
কালো ছাড়া অন্যকিছু থাকতে পারে না। আমি সাদা অন্যরা কালো।
সাদাকালোর
উদাহরনের অভাব নেই। জর্জ ওয়াকার বুশ বলেছিলেন আপনি আমাদের পক্ষে নয়ত টেররিষ্ট।
অন্যকিছু হতে পারেন না। বর্তমান বাংলাদেশে এর প্রকাশ আরো প্রকট হবে এটাই
স্বাভাবিক। আপনি হয় দেশপ্রেমিক নয় মৌলবাদি। একইসাথে দুটি হতে পারেন না। এর
মাঝামাঝি কিছু হতে পারেন না।
হাসনাত আবদুল হাই
বাংলাদেশের সাহিত্যে একটি পরিচিত নাম। কাজটি সহজ না। যারা সাহিত্যচর্চার চেষ্টা
করেছেন তারা জানেন জনপ্রিয়তার সুত্র কি। অনেকে বলেন হুমায়ুন আহমেদ সারা জীবন
মানুষকে খুশি করে সস্তা লেখা লিখে গেছেন, নিজের যোগ্যতা প্রকাশ করেননি।
হাসনাত আবদুল হাই
এর একটি গল্প ছাপা হয়েছিল জনপ্রিয় পত্রিকা প্রথম আলোয় (জনপ্রিয়তার সুত্র আরেকবার
মনে করতে পারেন)। মুল চরিত্রের সাথে শাহবাগের জনজাগরনের উল্লেখ রয়েছে। আর যাবেন
কোথায় ? আপনি দেশপ্রেমিক নাকি মৌলবাদি ? আপনার আসল উদ্দেশ্য কি ?
সাথেসাথে ফল।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে লেখা প্রত্যাহার করা হয়েছে, ভলের (!)জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। লেখক নিজেও ক্ষমা চেয়েছেন।
তিনি আসলে সাদাদের সাথে থাকতে চান। কাউকে ধুসর বা অন্যকিছু বলতে চাননি, ইত্যাদি
ইত্যাদি।
এর ব্যাখ্যা আপনি
নানাভাবে করতে পারেন। এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, আগে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে লেখক
নিজের অবস্থান তৈরী করেছেন অনেক মেধার বিনিময়ে, সেই মেধা পুরোপুরি অস্বিকার
করেছেন। তিনি বুঝেছেন লেখক পরিচিতি রাখতে হলে মাথা নিচু করতে হবে।
তিনি সাংবাদিক
নন। সাংবিদ কোন সংবাদ পরিবেশনের সময় ভুল করতে পারেন। ভুল তথ্য পেতে পারেন, ভুল
ব্যাখ্যা পেতে পারেন, অসংম্পুর্ন তথ্য পেতে পারেন। কাজেই তার ভুল হতেই পারে। লেখক
তো খবর সংগ্রহ করে পরিবেশন করেন না। লেখার বিষয় তৈরী হয় মাথায়। তিনি কি বলছেন
সেখানেই গন্ডগোল আছে! তাহলে তো তাকে লেখালেখি থেকে সরে যেতে হয়।
নাকি মনে মনে
বলছেন এই সময়ে সাহিত্য নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভাল। মানুষ স্লোগান চায়। অমুকের চামড়া
তুলে নেব আমরা, কিংবা কফিন রেডি লাশ চাই ইত্যাদি একসাথে করে কবিতা লেখা যেতে পারে
বরং। এগুলির চাহিদা বেশি। চিত্রকর্মের চেয়ে পোষ্টার বেশি জরুরী। যে যা চায় তাকে তো
সেটাই দিতে হয়।
প্রথিবীর সবচেয়ে
ক্ষমতাধর আমেরিকার দোষের অন্ত নেই একথা সবার জানা। আশ্চর্যজনকভাবে সেগুলি তুলে
ধরেন আমেরিকানরাই। এতে তাদের দেশের ভাবমুর্তি কতটা নষ্ট হল সেনিয়ে কেউ কথা বলেন
না। নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেংকারীর কথা ফাস করে দুজন সাংবাদিক পুরস্কৃত হয়েছিলেন,
হ্যাকিং এর অভিযোগে জেলে যাননি। এমনকি বাস্তবে অসম্ভব এমন বিষয় নিয়ে লিখলেও তাকে
লেখা বলেই ধরা হয়। প্রেসিডেন্টের পরকিয়া প্রেম, তাকে খুন করা, মন্ত্রী-গোয়েন্দা বিভাগ ব্যবহার করে সাক্ষিকে
হত্যার চেষ্টা করা, তার পরিবারকে আক্রমন করা ইত্যাদি নিয়ে জনপ্রিয় লেখা এবসলিউট
পাওয়ার একটি বড় উদাহরন। ক্লিন্ট ইষ্টউড এটা নিয়ে ছবি বানিয়েছেন। এজন্য প্রেসিডেন্টের
ভাবমুর্তি নষ্ট হয়নি, কাউকে ক্ষমা চাইতে হয়নি। হলিউডের সিনেমায় যেভাবে
দুর্নীতিগ্রস্থ পুলিশ থেকে মন্ত্রী দেখানো হয় তাতে তাদের নির্মাতাদের সবার একাধিকবার
মৃত্যদন্ড হতে পারত। সাহিত্য, টিভি রিপোর্ট, ভিডিও ডকুমেন্টারী এবং হলিউডি ছবি সবই
বন্ধ হয়ে যেতে পারত।
সেটা হয়নি। বরং
বন্ধ হয়েছে এবং হচ্ছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র কিংবা টিভি চ্যানেল। এরপর সাহিত্য বন্ধ
হলে অবাক হওয়ার কি আছে!
সাদাকালো সমাজে
যখন বাস করছি।
0 comments:
Post a Comment