সৈয়ত মুজতবা আলী
দির্ঘদিন জার্মানীতে ছিলেন। ছাত্র হিসেবে পড়েছেন শিক্ষক হিসেবে পড়িয়েছেন। একবার পরিচিত একজনকে খুজতে গিয়ে তার বিচিত্র
অভিজ্ঞতা হয়েছিল। যে ঠিকানায় তার বন্ধুকে পাওয়ার কথা
সেখানে গিয়ে একে-ওকে জিজ্ঞেস করে একই উত্তর পান, কেউ তাকে চেনেন না। শেষমেস তাকে যে বাড়িতে পেলেন সে বাড়িতে অন্তত
ডজনখানেক বার ঘুরে গেছেন। বাধ্য হয়ে তাকেই
জিজ্ঞেস করতে হল, এর মানে কি ? আপনাকে কি কেউই চেনে না ?
তার উত্তর, চিনবে
না কেন ? সবাই চেনে।
তাহলে কেউ ঠিকানা
বলল না কেন ?
এটা হিটলারের
নাজি বাহিনীর কর্মফল। তারা কারো
ঠিকানা খোজ করলে সবাই মনে করত সে নিখোজ হয়ে যাবে। প্রিয়জনদের হারানোর সেই পদ্ধতি তারা এখানো
ভোলেনি।
কিন্তু আমি যে
বললাম বন্ধু!
তাদের বক্তব্য,
বন্ধুই যদি হবেন তাহলে ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে হবে কেন।
এটা দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধের বহুবছর পরের ঘটনা। কোন ব্যক্তি নিখোজ হয়ে যাওয়ার অর্থ তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর কখনো তাকে দেখা যাবে না।
বাংলাদেশে হিটলার
নেই। তার বাহিনীও নেই। পুলিশ-র্যাব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্বপালন
করে। ইদানিং প্রতিদিনই টিভি ক্যামেরার সামনে
বক্তব্য দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন আইনে গুম
বলে কোন শব্দ নেই কাজেই কেউ হুম হচ্ছে না।
তবে মানুষ নিখোজ
হচ্ছে। গত ৩ বছরে প্রায় হাজার তিনেক মানুষ
নিখোজ হয়েছে। কখনো কখনো লাশ পাওয়া গেছে নদীতে। হাত নিখুতভাবে বাধা, শরীরে সিমেন্টের ব্যাগ বাধা। কারো কারো সেটুকুও মেলেনি। তারা নিরুদ্দেশ। আমেরিকানরা যুদ্ধে নিখোজ হলে সংক্ষেপে বলে
এমআইএ, মিসিং ইন একশন। এদের জন্য এমআই
এর কি লেখা যাবে ভেবে দেখা যেতে পারে।
একেবারে
সাম্প্রদিক ঘটনা, বিরোধীদলের একজন নেতা নিখোজ হয়েছেন। তার গাড়ি পাওয়া গেছে পথে, তিনি এবং ড্রাইভার
নিখোজ। হয়ত অন্যগ্রহের প্রানী এসে ধরে নিয়ে
গেছে গবেষনা করার জন্য।
বিরোধী দল
বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়নি। ক্রমাগত যখন এই ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে, নিয়মে পরিনত
হচ্ছে তখন তারাও যে নিখাজ হবেন না সেই নিশ্চয়তা দিচ্ছে কে ?
কাজেই পরপর দুদিন
ছাড়িয়ে তৃতীয় দিনে পা দিয়েছে হরতাল। আগামীতে আরো হবে ধরে নেয়া যায়।
আর সমস্যা
সেখানেই। মানুষ হরতাল চায় না। মানুষ শান্তি চায়। হরতালের নামে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি, জনগনের
দুর্ভোগ, জ্বালাও-পোড়াও এসব দেখতে চায় না। এভাবে দেশকে পঙ্গু করা হোক সেটা সচেতন বাঙালী চাইতেই পারে না।
আশ্চর্যজনকভাবে
কিছু মানুষ এধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পছন্দ করে। ৭১ সালেও করেছিল। পাকিস্তানীদের ভাষায় তারা ছিল দুস্কৃতকারী। আরো আশ্চর্যজনকভাবে সেই দুস্কৃতকারীরাই বর্তমানে
বাঙালীর সবচেয়ে বড় গর্ব। হরতাল যেমন ভাল
জিনিষ না যুদ্ধও তেম ভাল জিনিষ না। ৭১ সালে যারা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন তারা জানেন
যুদ্ধ মানে কি। তারপরও তারা জীবন দিয়েছেন বলেই আমরা স্বাধীন দেশে বাস করছি।
দুটো বিষয় একসাথে
করলে বিষয়টা অদ্ভুত হয় এতে সন্দেহ নেই। একদল মানুষ বলছে কে এক ইলিয়াস নামের সন্ত্রাসী তারজন্য সারা দেশের
মানুষের দুর্ভোগ। এটা হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটা আসলে দেশের শান্তি
নষ্ট করার নিলনকশা। খালেদা জিয়ার পরামর্শে ইলিয়াস লুকিয়ে
থাকতে পারে। গুম-খুন জোট সরকারের সৃষ্টি। তারা
দেশের মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিতে চায় না।
আরেকদল বলছে, ইলিয়স
দোষি না নির্দোস সে বিচারের দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল আইনের। তাকে অমুক অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে একথা বলে
জেল-ফাসি যে কোনকিছু হলে সাধারন মানুষ আদৌ তাকে নিয়ে মাথা ঘামাত না।
দুজনার কথাই ঠিক।
মাঝখানে আরেকটা পরিবর্তন ঘটে চলেছে এটাও ঠিক। হয়ত আগামী কারো ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে
প্রত্যেকেই বলবেন, ওই নামে কাউকে চিনি না। জীবনে ওই নাম শুনিনি।
0 comments:
Post a Comment